চামড়ার বাজার
নির্দেশনারই দর পতন?
ফাইল ছবি
.
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ১০:৩৬
গত কয়েক বৎসরের ন্যায় এইবারও কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ধস নামিয়াছে বলিয়া সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যেই সংবাদ দিয়াছে, উহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। প্রতিবারের ন্যায় এইবারও সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন দর ‘যথারীতি’ উপেক্ষিত। ট্যানারি মালিক ও বৃহৎ আড়তদারগণ চামড়ার বাজার হইতে সরকার নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অনেক কম দামে কাঁচা চামড়া ক্রয় করিয়াছেন। ফলে বিভিন্ন স্থান হইতে সংগৃহীত চামড়া বিক্রয় করিতে গিয়া মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়িয়াছেন।
প্রতিবেদনমতে, এইবার ঈদুল আজহায় ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ হইতে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যাহা গত বৎসরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। তবে গত বৎসরের তুলনায় প্রতিটি চামড়া ১৫০ হইতে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রয় করিতে হইয়াছে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। উপরন্তু এইবারও ছাগলের চামড়া ক্রয়ে আগ্রহ দেখান নাই ব্যবসায়ীরা।
আমরা জানি, কোরবানিদাতা অনেকে বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া দান করিয়া থাকেন। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এইগুলি ক্রয় করিয়া আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রয় করেন। সাধারণত ইহাদের নিকট হইতে ট্যানারি মালিকগণ চামড়া ক্রয় করিয়া থাকেন। কোনো কোনো কোরবানিদাতা সরাসরি মৌসুমি ব্যবসায়ীদের নিকট চামড়া বিক্রয় করিয়া প্রাপ্ত অর্থ দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করেন। ফলে চামড়ার দর পতনের প্রধান ধাক্কা মূলত সহিতে হয় দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের। আমাদের প্রশ্ন, যেই নির্দেশনা কার্যকর করা যাইতেছে না, উহা প্রতি বৎসর জারি করা হয় কী উদ্দেশ্যে? চামড়ার দরের পূর্বে নির্দেশনার দরই কি পতন হইতেছে?
উল্লেখ্য, ট্যানারি মালিকদের বিরুদ্ধে কোরবানির চামড়া ক্রয়ের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগটি বহু পুরাতন। ইতোমধ্যে দেশে একাধিক সরকার বিদায় লইলেও পরিস্থিতির কোনো ইতরবিশেষ ঘটে নাই। বিশেষত মৌসুমি ব্যবসায়ীগণ এইবারও অভিযোগ করিয়াছেন, প্রতি বৎসর ঈদের পূর্বে সরকার কাঁচা চামড়ার দাম ঘোষণা করিলেও বাজার তদারকিতে উহার কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না। ফলে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও ট্যানারি মালিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। ট্যানারি মালিকদের অবশ্য এহেন অভিযোগ খণ্ডনে কোনোবারই যুক্তির অভাব হয় না; এইবারও হয় নাই। তাহাদের বক্তব্য, এইবার কোরবানির সংখ্যা কম হইতে পারে– এই ধারণা হইতে তাহারা অন্যবারের তুলনায় কম চামড়া সংগ্রহ করিবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করিয়াছেন। অর্থাৎ তাহারা চামড়ার আলোচ্য দর পতনকে চাহিদার ঘাটতিজনিত বলিতে চাহেন। কিন্তু চাহিদা যাহাই হউক, নিয়ম অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত দরের কমে তাহারা চামড়া কিনিতে পারেন না, ইহা তাহাদের মানিতেই হইবে। বস্তুত সরকার উহার নির্দেশনা কার্যকরে আন্তরিক নহে বলিয়াই ট্যানারি মালিকগণ নিজেদের পক্ষে এহেন সাফাই গাহিতে পারিতেছেন।
এমন অভিযোগও অমূলক নহে, সরকার তৈলাক্ত মস্তকে তৈল সিঞ্চন করিতে গিয়া সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষদের বঞ্চিত করিয়াছে। তবে সরকারকে ভাবিতে হইবে, এহেন পরিস্থিতির পরিণাম শুধু দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের বঞ্চনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকিবে না; সম্ভাবনাময় ট্যানারি শিল্পকেও ক্ষতির মুখে ফেলিতে পারে। কারণ, এহেন বিরূপ পরিস্থিতি একদিকে কাঁচা চামড়ার বহির্মুখী চোরাচালান বৃদ্ধি পাইতে পারে, অন্যদিকে চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণে কোরবানিদাতা ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে অবহেলা ও অমনোযোগ বাড়িতে পারে। চামড়ার ক্রয়-বিক্রয়ে সরকারি নির্দেশনা দ্রুত কার্যকরে সংশ্লিষ্ট সকলে সক্রিয় হইবেন– এই প্রত্যাশা আমাদের।
