ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিশু নির্যাতন: সম্মিলিত দায়

শিশু নির্যাতন: সম্মিলিত দায়
×

প্রতীকী ছবি

সোহাগ ফেরদৌস

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ১০:৪০ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ১৭:২৮

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে– ঈশ্বরী পাটনীর এই বর যেন দুনিয়ার সব মায়ের। আমাদের সন্তানরা এখন অনেকটা দুধে-ভাতে থাকলেও দেশে সাম্প্রতিক শিশু নির্যাতনের নির্মমতা ও নৃশংসতায় আতঙ্কিত সবাই। শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড যে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা শুধু আমাদের বিবেককে স্তব্ধ করে না, বরং পুরো সমাজ কাঠামোর অন্তরালে বিদ্যমান জীবনের ফাঁকি, মিথ্যার ভিতে জীবনের কায়েমি বেসাতি, সামাজিক অন্ধকারে বিদ্যমান অন্যায্যতা, রিপু-তাড়িত বিপথগামী মানুষের অন্তর্গত অস্তিত্ব ও নৈতিক অবক্ষয়কে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে।

একটা সময় ছিল যখন অপরাধীরা আড়ালে অপরাধ করত এবং ধরা পড়ার ভয়ে থাকত তটস্থ। কিন্তু বর্তমানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং উদ্বেগজনক। এখন শিশুকে নির্যাতন করার সময় সেই পাশবিকতার চিত্র মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয় এবং তা অত্যন্ত নির্বিকার চিত্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক মাধ্যমে। অপরাধের এই আধুনিক ধরন ও অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি সমাজ-মানসের এক ভয়ানক ব্যাধিকে নির্দেশ করে। এর সঙ্গে যখন যুক্ত হয় আমাদের বিচার ব্যবস্থার চিরচেনা কচ্ছপ গতি, তখন অপরাধীদের মনে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এক বেপরোয়া উন্মাদনা তৈরি হয়। 

গত বছরের ৫ মার্চ মাগুরায় শিশু আছিয়া তারই পিতৃতুল্য বোনের শ্বশুর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। ১৩ মার্চ শিশুটির চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুতে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হলে অপরাধীকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা আজও চলমান। এদিকে পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগে ঢাকার পল্লবীতে ঘটে নারকীয় ঘটনা। শিশুটিকে নির্যাতন ও গলা কেটে হত্যা করে তারই প্রতিবেশী। উভয় ক্ষেত্রে তাদের স্ত্রী ছিল সহযোগীর ভূমিকায়। এ রকম হাজারো শিশু পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ-ছন্দ বোঝার আগেই আত্মীয় বা প্রতিবেশীর হেনস্তার শিকার হয়। শুধু কি তাই! সমাজের আলোকবর্তিকার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের কাছেও নিরাপদ নয় আমাদের শিশুরা। সম্প্রতি নেত্রকোনার মদনে ১১ বছরের শিশুর অন্তঃসত্ত্বা হওয়াকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ঘৃণার ঝড় ওঠে। একুশ শতকে এসেও কওমি মাদ্রাসা থেকে পাস করা কিছু যুবক এ দেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে তুলছে মাদ্রাসা। যার ন্যূনতম তদারকি সরকারের নেই। তথাকথিত কিছু হুজুরের মর্জিমতো গড়ে তোলা এসব মাদ্রাসায় শুধু মেয়ে শিশু নয়, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ছেলেশিশুও। পত্রিকার খবরে যার যৎসামান্যই উঠে আসে। অতি পরিচিত ও আত্মীয়, এমনকি শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের কর্মচারীদের দ্বারা হেনস্তার শিকার মেয়ে ও ছেলেশিশুরা সাধারণত ঘটনার ভয়াবহতায় চুপসে যায়, এমনকি বাবা-মায়ের কাছেও ঘটনা প্রকাশ করে না।

লোকলজ্জা এবং ভয়ের চাদরে ঢাকা এসব অপরাধ নারী ও শিশুর মনস্তত্ত্বকে চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে। যখন ঘর, বিদ্যালয় কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; কোথাও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, আমাদের শিশুরা কোথায় নিরাপদ? 

শিশুরা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। কিন্তু যে রাষ্ট্রে চেনা মানুষ, শিক্ষক কিংবা স্বজনের কাছ থেকে সন্তানদের বাঁচাতে অভিভাবকদের প্রতিনিয়ত আশঙ্কায় দিন কাটাতে হয়, সেখানে অন্যান্য দৃশ্যমান উন্নয়নই অর্থহীন ও অন্তঃসারশূন্য। সামাজিক অবক্ষয়ের মূল উপড়ে ফেলে, সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার ও সস্তা উত্তেজনার সংস্কৃতি রুখে দিয়ে অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি ঠেকাতে হবে। রাষ্ট্র, বিচার বিভাগ এবং সচেতন সমাজ যদি এখনই সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে না তোলে, তবে আমাদের এই নীরবতা আগামী দিনে আরও বহু শিশুর জীবনপ্রদীপ কেড়ে নেবে। আর সেই ঐতিহাসিক দায় কোনোভাবেই আমরা এড়াতে পারব না। 

সোহাগ ফেরদৌস: শিক্ষক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×