ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তাৎক্ষণিক

পল্লবীর শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচারে নতুন জটিলতা?

পল্লবীর শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচারে নতুন জটিলতা?
×

আদালতে আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিনেই সোহেল আদালতে নিজের বক্তব্য থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ১৮:৪১

শুরুতেই কি নাটকীয় মোড় নিতে চলেছে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীর আট বছরের শিশুটি ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার বিচারকাজ? পুলিশের কাছে জবানবন্দিতে দায় স্বীকার করে আবার আদালতে এসে তাহলে কেন নিজেকে কম দোষী দাবি করে নতুন একজনের নাম এনেছে আসামি সোহেল?

গত ২০ মে পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে অভিযুক্ত আসামি সোহেল ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেছিল। এমনকি এ ঘটনায় তার স্ত্রী অভিযুক্ত অপর আসামিও সহযোগিতা করেছে, সে কথা জানিয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ গঠন করে আদালতে আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিনেই ১ জুন সোহেল আদালতে নিজের বক্তব্য থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। এবং সেখানে সে যুক্ত করেছে আরেকটি নতুন নাম। 

সোমবার সোহেল রানা আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেছে, ‘আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন।’ এ সময় সোহেল আরও বলেছে, ‘আমি পাপ করেছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দিন।’ সোহেলের দাবি, মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল। এসব তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বরাতে। 

সমকাল অনলাইনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সকাল পৌনে ৮টার দিকে প্রিজন ভ্যানে আসামিদের আদালতে আনা হয়। বেলা ১১টা ১০ মিনিটে কোর্ট বসলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অভিযোগটি পড়ে শোনান। পরে বিচারক আসামিদের কাছে জানতে চান তারা দোষী, নাকি নির্দোষ। এ সময় আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, সোহেলের এমন বক্তব্যের পর আদালতে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে দিয়েছেন। 

এই ঘটনাকে নাটকীয় মোড় বলা হচ্ছে এ কারণে, গত ২০ মে সোহেল রানা দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিল। সেই জবানবন্দিতে বলেছিল, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শিশুটি ঘর থেকে বের হলে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে ছোট্ট শিশুটিকে ধর্ষণ করে সোহেল। এতে জ্ঞান হারায় শিশুটি। এর মধ্যে তার মা দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এ সময় সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করে। মরদেহ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করে। দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিল। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল। 

দেশজুড়ে তোলপাড় করা এই নৃশংস ঘটনায় কেন দশ দিন পরই প্রধান আসামি নিজের বক্তব্য বদলাল, তা এখনই জানার সুযোগ নেই আমাদের। তবে এটি সময়ক্ষেপণের অভিসন্ধি কিনা, সে সন্দেহ প্রথমেই ভাবনায় আসবে। তাই হয়তো এ খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে উঠে এসেছে মানুষের তীব্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন, সমঝোতা হয়ে গিয়েছে, এখন শুধু বিজ্ঞাপন চলবে। কেউ লিখেছেন, নতুন নাটক সাজানো হচ্ছে। কারও বক্তব্যে উপচে পড়ছে ক্ষোভ, তারা বলছেন আগে ফাঁসি দিয়ে দেওয়া হোক, এরপর দেখা যাবে। আরেকজন লিখেছেন, কিছুদিন পরে নিউজ হবে এটা, এবার ডলারের খোঁজ না পাওয়ার কারণে শাস্তির মুখোমুখি করানো হচ্ছে না। সামাজিক মাধ্যমে মানুষের এই ক্ষোভের বড় কারণ দুটি, ঘটনার নৃশংসতা এবং বাংলাদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি। 

গত ১৯ মে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ছোট্ট শিশুটিকে নির্যাতন ও হত্যার যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। এত ভয়াবহ একজন সাইকোপ্যাথকে মানুষ আদালতে পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ দিতে চায়নি। নিজেরাই বিচার করতে চেয়েছিল। কেননা বাংলাদেশে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যাচ্ছে, পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুসারে ২০২৪ সালে ধর্ষণের মামলা হয়েছিল পাঁচ হাজার ৫৬৬টি। ২০২৫ সালে সংখ্যা দাঁড়ায় সাত হাজার ৬৮টিতে। বিচারহীনতার একটি উদাহরণ পাওয়া যাবে মামলার দীর্ঘসূত্রতা থেকে। উচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ৩৫ হাজারেরও বেশি ধর্ষণের মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন রয়েছে। সারাদেশে বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। এর মধ্যে কত বাদী যে মারা গিয়েছেন ইয়ত্তা নেই। কুমিল্লার তনু হত্যাকাণ্ড মামলার ঘটনায় ১০ বছর লেগেছে শুধু সামান্য অগ্রগতি হতে। 

ফলে ১ জুন আদালতে সোহেল রানার আগের দেওয়া জবানবন্দি বদলে এখন নির্দোষ দাবি এবং আরেকটি নাম সংযোজন এখন আতঙ্কিত করছে। তাহলে কেন ২০ মের জবানবন্দিতে সোহেল রানা এও জানিয়েছিল যে সেদিনের ঘটনার আগে সে ইয়াবা সেবন করেছিল। এমনকি ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে আগের কোনো শত্রুতা ছিল না, তাও বলেছিল। আকস্মিক এই নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চাওয়া আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন তুলছে। আট বছরের শিশুর সঙ্গে এমন পাশবিক ঘটনাও যদি বিচারহীনতার সংস্কৃতির তালিকাভুক্ত হয়, তাহলে কি কখনও কোনোদিন কোনো ধর্ষণকারী আর শাস্তির ভয় পাবে? আমরা কি নিজেদের কোনো কন্যাসন্তানকে নিরাপদ মনে করতে পারব আর এই দেশে?

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×