ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সহজিয়া

দক্ষিণ এশিয়া, বিভাজন এবং জীবন্ত পৃথিবীর সংগ্রাম

দক্ষিণ এশিয়া, বিভাজন এবং জীবন্ত পৃথিবীর সংগ্রাম
×

আনুশেহ আনাদিল

আনুশেহ আনাদিল

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের সময়ের ট্র্যাজেডিগুলোর একটি–মানুষ এতটাই বিভাজনের মধ্যে ডুবে গেছে, সে আর পায়ের নিচের মাটি সরে যাওয়ার শব্দও শুনতে পাচ্ছে না। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, দলাদলি ও সামাজিক মাধ্যমের অন্তহীন সংঘর্ষে আমরা ব্যস্ত। এতটাই ব্যস্ত, আমাদের চোখের সামনেই নদী মরে যাচ্ছে, বন উধাও হয়ে যাচ্ছে, বীজ করপোরেট মালিকানায় চলে যাচ্ছে, সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন হচ্ছে আর রাষ্ট্র ও অর্থনীতির ওপর নতুন ধরনের ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

মানুষ তর্ক করছে– কে প্রকৃত মুসলমান, কে কোন মতের অনুসারী, কে দেশপ্রেমিক, কে ধর্মভীরু, কে আধুনিক, কে প্রগতিশীল। সামাজিক মাধ্যম এই বিভাজনকে আরও উস্কে দিচ্ছে। রাজনৈতিক মেরূকরণ বিনোদনে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় সংঘর্ষ জনমোহন নাটকে রূপ নিচ্ছে। আধুনিক মানুষ ক্রমেই এমন এক মানসিক অবস্থায় প্রবেশ করছে, যেখানে তাঁকে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে, বিভ্রান্ত রাখা হচ্ছে এবং ক্রমাগত একে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। এই বিভাজন যত বাড়ছে, ক্ষমতার কাঠামো তত নিঃশব্দে শক্তিশালী হচ্ছে।

এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। উপনিবেশবাদ সবসময় ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্ম, ভাষা ও জাতিগত বিভাজনকে প্রশাসনিক কাঠামোর অংশে পরিণত করেছিল। জনগণকে নিজেদের ভেতর বিভক্ত করে রাখা ছিল শাসনের সহজ উপায়। স্বাধীনতার বহু দশক পরও সেই মানসিক কাঠামো আজও রয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক সীমান্ত, ভয়, সন্দেহ, বিভাজন ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি এখনও আমাদের রাজনৈতিক চেতনার ভেতরে কাজ করে যাচ্ছে।

আজকের ডিজিটাল যুগে সেই পুরোনো বিভাজন আরও নতুন রূপ নিয়েছে। অ্যালগরিদম মানুষের ক্রোধকে পুঁজি বানায়। কারণ ক্রোধ সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায়। সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ, ভয় ও উগ্রতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। ফলে সাধারণ মানুষ ক্রমেই বাস্তব সমস্যা থেকে দূরে সরে যায়। অথচ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে পরিবেশগত। নদী কোনো রোমান্টিক প্রতীক নয়; নদী মানে জীবন। বন কোনো বিলাসিতা নয়; বন মানে বেঁচে থাকার শর্ত। বীজ কোনো ব্যবসায়িক পণ্য নয়; বীজ মানে সভ্যতার ধারাবাহিকতা। মাটি কোনো সম্পত্তি নয়; মাটি মানে অস্তিত্ব।

বাংলার সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুন্দরবন, হাওর, বিল, বর্ষা– এসব শুধু ভূগোল নয়; আমাদের সংস্কৃতির আত্মা। বাংলার গান, কবিতা, কৃষি, খাদ্য, লোকজ জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা– সবকিছু এই প্রকৃতির শরীর থেকে জন্ম নিয়েছে। নদী মরলে শুধু পানি মরে না; মানুষের স্মৃতি মরে যায়, সংস্কৃতি মরে যায়। ভাষার সুর বদলে যায়।

কিন্তু আধুনিক উন্নয়ন ব্যবস্থা প্রকৃতিকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখে না। তাকে কেবল ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখা হয়; যা উত্তোলন, বিক্রি ও ভোগ করা যায়।
বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক করপোরেট কাঠামো আজ খাদ্য ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এক ফসলি কৃষি, রাসায়নিক নির্ভরতা, জেনেটিকভাবে নিয়ন্ত্রিত বীজ, কীটনাশকনির্ভর উৎপাদন এবং দূরবর্তী করপোরেট সরবরাহ ব্যবস্থা স্থানীয় কৃষিকে ধ্বংস করছে। কৃষক তাঁর নিজের বীজ হারাচ্ছে। গ্রাম হারাচ্ছে তার স্বনির্ভরতা। লোকজ চিকিৎসা, মাটির জ্ঞান, মৌসুমি চাষাবাদ, স্থানীয় বৈচিত্র্য; সবকিছু ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে।

এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি গভীরভাবে সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক। যখন মানুষ মাটির সঙ্গে সম্পর্ক হারায়, তখন সে নিজের সঙ্গেও সম্পর্ক হারায়। সে উৎপাদক থেকে ভোক্তায় পরিণত হয়। মানুষ প্রকৃতির সন্তান না হয়ে বাজারের পণ্যে পরিণত হয়। গ্রাম খালি হয়ে যায়। লোকসংগীত হারিয়ে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত জ্ঞান হারিয়ে যায়।

একই সময়ে নজরদারি প্রযুক্তি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, অভ্যাস, চলাফেরা, যোগাযোগ– সবকিছু ক্রমেই তথ্যব্যবস্থার অংশে পরিণত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীভূত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো মানুষের স্বাধীনতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে।

ইতিহাস বলে, যখন মানুষ ভয় পায়, তখন সে স্বাধীনতার বিনিময়ে নিরাপত্তা মেনে নিতে প্রস্তুত হয়। অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, সন্ত্রাস, মহামারি, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে মানুষকে সহজেই আরও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া যায়।

এ কারণেই সাধারণ মানুষের সংহতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি তার বহুত্ববাদ। হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, আদিবাসী, সুফি, বাউল, শাক্ত, বৈষ্ণব, লোকজ, আধ্যাত্মিক নানা ধারার মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেছে। এ অঞ্চল তার শ্রেষ্ঠ অবস্থায় ছিল মিশ্র, বহুস্বরিক ও সহাবস্থানের ওপর দাঁড়ানো।

কিন্তু আধুনিক রাজনীতি সেই বহুত্ববাদকে রক্ষা করার পরিবর্তে প্রায়ই বিভাজনের অস্ত্রে পরিণত করে।
কল্পনা করা যাক– যদি মানুষ ধর্মীয় ঘৃণার বদলে নদী রক্ষার জন্য একত্রিত হতো? যদি বন রক্ষা রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতো?
যদি বীজ সংরক্ষণ সামাজিক মাধ্যমের তর্কের চেয়ে বেশি জরুরি মনে হতো? যদি নেতৃত্বকে বিচার করা হতো– কত নদী পরিষ্কার হলো, কত বন ফিরে এলো, কত কৃষক স্বনির্ভর হলো, কত কম দুর্নীতি হলো এসব দিয়ে?

ভবিষ্যতের পৃথিবী সম্ভবত কেবল মতাদর্শগত সংঘর্ষের নয়; এটি হবে পরিবেশগত টিকে থাকার সংগ্রাম। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য সংকট, পানি সংকট, অতিরিক্ত তাপ, জলবায়ু উদ্বাস্তু, জীববৈচিত্র্যের পতন– এসব আগামী শতাব্দীর রাজনীতি নির্ধারণ করবে। তবু আশার জায়গা আছে।
শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের সংগ্রাম হয়তো সভ্যতার বিরুদ্ধে সভ্যতার যুদ্ধ নয়। হয়তো এটি হবে সেই শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম, যারা পৃথিবীকে কেবল বাজার হিসেবে দেখে এবং সেই মানুষদের সংগ্রাম, যারা এখনও মনে রাখে– পৃথিবী কোনো পণ্য নয়; পৃথিবী আমাদের জীবন্ত ঘর।

আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন

×