ইসলাম ও সমাজ
পরিবেশ সুরক্ষায় ইসলামের বার্তা
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
পরিবেশ আল্লাহতায়ালার মহান নিয়ামত। মানুষ, পশুপাখি, বৃক্ষ, নদী, পাহাড়, আকাশ, পৃথিবী– সবকিছু মিলেই পরিবেশ গঠিত। ইসলাম শুধু মানুষের ইবাদত-বন্দেগির শিক্ষা দেয় না; বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহারের দিকনির্দেশনাও দেয়। কোরআন ও হাদিসে পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা আজকের জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের যুগে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
আল্লাহতায়ালা সুরা আর রাহমানের ৭-৮ আয়াতে এরশাদ করেছেন, ‘তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন ভারসাম্য, যাতে তোমরা ভারসাম্য নষ্ট না করো।’ এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা মানুষের দায়িত্ব। পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ড এই ভারসাম্যকে নষ্ট করে, যা আল্লাহর নির্দেশের পরিপন্থি।
পবিত্র কোরআনের সুরা আর-রুমের ৪১ আয়াতে আরও এরশাদ হয়েছে– ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থল ও জলভাগে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে; যাতে আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের ফল আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।’
বর্তমান বিশ্বে বায়ুদূষণ, নদীদূষণ, বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন। মানুষের অসচেতনতা ও লোভ প্রকৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইসলাম অপচয় ও অপব্যয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। আল্লাহতায়ালা সুরা আল-আরাফের ৩১ আয়াতে এরশাদ করেন– ‘তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’
পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই ইসলামের শিক্ষা– প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা এবং অপচয় থেকে বিরত থাকা।
হাদিস শরিফে রাসুলে কারিম (সা.) পরিবেশ সংরক্ষণে বৃক্ষরোপণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে বা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস বৃক্ষরোপণকে শুধু সামাজিক কাজ নয়, বরং ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। গাছ পরিবেশকে শীতল রাখে, অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। তাই বেশি বেশি গাছ লাগানো ইসলামের একটি প্রশংসনীয় আমল।
ইসলাম প্রাণীদের প্রতিও দয়া ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। হাদিসে বর্ণিত, রাসুলে কারিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘যারা পৃথিবীর প্রাণীদের প্রতি দয়া করে, দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন।’ (সুনানে তিরমিজি)
প্রাণী হত্যা, নির্যাতন বা তাদের আবাসস্থল ধ্বংস করা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণিজগতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকে ইসলাম ইমানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। হাদিসে বর্ণিত, মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক।’ (সহিহ মুসলিম)
রাস্তা, নদী, খাল, পুকুর কিংবা জনসমাগমস্থলে ময়লা-আবর্জনা ফেলা পরিবেশদূষণের কারণ। একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো নিজের চারপাশ পরিষ্কার রাখা এবং অন্যদেরও পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা।
ইসলামে পানির উৎস সংরক্ষণের ওপরেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) স্থির পানিতে অপবিত্রতা সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন। এর মাধ্যমে পানিদূষণ রোধ এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আজকের দিনে নদী-খাল ও জলাশয়ে শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক ফেলা ইসলামের এই শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।
পৃথিবী নামক ছোট এ গ্রহে জীবের বেঁচে থাকার জন্য সব উপাদান দিয়ে আল্লাহতায়ালা পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের নানা অত্যাচারে পৃথিবীর পরিবেশ দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ফলে জীবের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ হারাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
হাদিস শরিফে রাসুলে কারিম (সা.) পরিবেশ সুরক্ষায় নানা উপায় বাতলে দিয়েছেন। আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। কেবল পরিবেশ দিবসেই নয়, বরং সুস্থতার জন্য প্রতিদিন পরিবেশসম্মত আচরণের বিকল্প নেই। ইসলামের সেটাই শিক্ষা।
পরিবেশ সুরক্ষা কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। একজন মুমিন জানেন, পৃথিবী আল্লাহর আমানত। এই আমানতের যথাযথ সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের কর্তব্য।
ইসলাম পরিবেশ সংরক্ষণে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, অপচয় পরিহার, বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রাণিকুলের প্রতি সদয় আচরণ করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। আমরা যদি ইসলামের এসব নির্দেশনা বাস্তবজীবনে অনুসরণ করি, তবে একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। মহান আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার
