পরিবেশ দিবস
প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণার প্রতিবেশগত তাগিদ
মাহবুবা নাসরীন
মাহবুবা নাসরীন
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ | ১১:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটা গাছের গায়ে লেখা ছিল– ‘আমি তোমাকে দিই আর্দ্রতা ও অক্সিজেন, বিনিময়ে তোমার কাছে পাই কার্বন মনোক্সাইড’। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রকৃতির দ্বারস্থ হবার বিকল্প নেই– এই সত্য মানব জাতি দেরিতে হলেও উপলব্ধি করেছিল আশির দশকে, যখন শিল্পোন্নত যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে কিছু প্রকৃতিপ্রেমী সোচ্চার হয়েছিল বাতাস ও পানির প্রাকৃতিক গুণাগুণ আগের মতো নেই অনুভব করে। পরিবেশের আদি গল্পগুলো তার পর থেকে ধীরে ধীরে বিশ্ব পরিমণ্ডলে আলোচিত হতে থাকে।
তারও আগে সত্তরের দশকে বৈশ্বিক সেমিনার ‘রিও সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের পরিবেশ-বিষয়ক দু-একটি আয়োজনেও পরিবেশ রক্ষার্থে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া তথা কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে থাকে। আশির দশকের মাঝামাঝি শিল্প মালিকদের পরিবেশ দূষণরোধে নিয়ন্ত্রক ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়। তবে ওই সময় তাদের ওপর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়নি। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব দূষণকারীর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলে যেমনটি হয়, বাস্তবে তেমনটিই হয়েছে। যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন ও নগরায়ণ হয়েছে। নদী বা জলাধার দখল অথবা দূষিত হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ পানি শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হয়েছে; সমপরিমাণ দূষিত হয়ে বিভিন্ন জলাশয়ে ও নদীতে তা ফিরে এসেছে। বিশেষত ভূগর্ভস্থ পানির নির্বিচার ব্যবহার যেমন সুপেয় পানির সংকট তৈরি করেছে, তেমনই ভূপৃষ্ঠের যতটুকু পানি শিল্পে অব্যবহৃত ছিল, সেটারও উল্লেখযোগ্য অংশ দূষণ ঘটিয়েছে। পানি ব্যবহার ও দূষণের এই চক্রে পড়ে প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে বৈচিত্র্য। জলের মাছ ও স্থলের উদ্ভিদ হারিয়েছে প্রাণ।
নব্বইয়ের দশকে স্টিভেন এফ. মিনকিনের বহুল উচ্চারিত গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে ২৭১ ধরনের মৎস্য প্রজাতি উধাও হয়ে গেছে সত্তরের দশকেই। নব্বইয়ের দশকে ৫০ শতাংশ আমন ধানের উৎপাদন কমে গেছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, লবণাক্ততা, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বেড়েছে।
নতুন নতুন দুর্যোগ– শীত বা গরমের তীব্রতা, বজ্রপাতে প্রাণ বা ফসলহানি, ঝটিকা বা হঠাৎ বন্যার মতো নানা ধরনের দুর্যোগের সঙ্গে পরিবেশ অবক্ষয় বা জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ার সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় বৈজ্ঞানিক অন্যান্য গবেষণায়।
বিশ্বায়নের প্রভাবে প্রকৃতির সঙ্গে যোগ হয়েছে রাসায়নিক কৃত্রিমতা। ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক একদিকে উপকারী পোকামাকড় এমনকি পাখিকেও বিপন্ন করে তুলেছে; অন্যদিকে বৃষ্টি ও বন্যায় সেই কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ বিভিন্ন জলাশয়ে গিয়ে মাছের বৈচিত্র্য ও উৎপাদন কমিয়েছে। বিলুপ্ত প্রজাতিকে বিকল্প ব্যবস্থাপনায় গবেষণাগারে ফিরিয়ে আনার বহু চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন অবকাঠামোও খোদ পরিবেশের জন্যই বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করেছে। যেমন যখন হাওর অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন ফিরে যেতে হয় প্রবীণ ব্যক্তির কাছে। কিশোরগঞ্জের এক প্রবীণ ব্যক্তি আমাকে বলেছিলেন, আমাদের প্রাকৃতিক বাঁধ ছিল ঢোলকলমি গাছ বা সুনামগঞ্জের কেউ বলেন করস গাছ। ইটের রাস্তা বা টাইলসের বাঁধ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়। কিন্তু প্রাকৃতিক বাঁধগুলো যেত না।
আমাদের পরিবেশ থেকে পাখি হারিয়ে যাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। যেমন হারিয়ে যাওয়া তেলসুর গাছে বসত ভুবন চিল। প্রকৃতিতে সেসব অনুদান স্রষ্টার ভারসাম্যের অপূর্ব উদাহরণ। মানুষ যখন উপলব্ধি করেছে, অন্যান্য প্রাণীর মতো সেও এক প্রজাতি, ততদিনে অন্যান্য প্রজাতির অনেকই বিলুপ্ত।
ক্রমাগত পরিবেশ অবনমনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের অভিন্ন ভবিষ্যৎ সুরক্ষার তাগিদ থেকে টেকসই উন্নয়ন ধারণার যাত্রা শুরু হয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে জাতিসংঘের কর্মপরিকল্পনা বা কাঠামো অথবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে বিশ্বব্যাপী কণ্ঠস্বর শোনা গেছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এগিয়ে এসেছে এক শক্তিশালী তরুণ সমাজ। যাদের জন্য প্রয়োজন বাসযোগ্য পৃথিবী।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮/ক ধারায় প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার মাধ্যমে পরিবেশ, প্রতিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জীববৈচিত্র্য, জলাধার, বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গীকাররূপে গণ্য করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডেল্টা প্ল্যান ২১০০, ভিশন ২০৪১, বিশ বছরের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১), পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, পরিবেশ রক্ষা আইন, নীতিমালা, জাতীয় সংরক্ষণ কর্মকৌশল (২০২১-৩৬) প্রভৃতি দলিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার অঙ্গীকারের আলোকে প্রণীত। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ন্যাশনাল কনজারভেশন স্ট্র্যাটেজিস-এনসিএস সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের নীতিমালা রচিত। তবে সব সময়ের মতো পরিবেশ প্রকৃতি রক্ষার যে আশঙ্কা থেকে যায়, সেটি হলো বাস্তবায়নের। সরকারি, ব্যক্তি খাত ও বেসরকারি– সব উদ্যোগের সম্মিলিত প্রয়াস ও আন্তরিকতার মাধ্যমে। সবার সচেতনতার পাশাপাশি সুন্দরবন থেকে শুরু করে জলাভূমি, গোচারণভূমি, খাসজমি, চরাঞ্চল, হাওর, বন্যাপ্রবণ, ঘূর্ণিঝড়প্রবণ, খরাপ্রবণসহ প্রতিবেশ রক্ষায় রাজনৈতিক অর্থনীতি, সামাজিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এবার বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা, জলবায়ুর জন্য, ভবিষ্যতের জন্য’ তাগিদ দেয়– আমাদের আর বসে থাকার সময় নেই।
ড. মাহবুবা নাসরীন: অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- পরিবেশ
