ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

উন্নয়ন

বিদ্যালয়ে অর্থায়ন এবং বাস্তবতার ফারাক

বিদ্যালয়ে অর্থায়ন এবং বাস্তবতার ফারাক
×

এম এম মুসা

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম কয়েক বছর আগে। তৃতীয় শ্রেণির এক মেয়ে বলছিল, ‘স্যার, লাইব্রেরিতে গল্পের বই থাকলে আমি প্রতিদিন পড়তাম।’ লাইব্রেরিই নেই। স্কুলে এসএলআইপি (স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান)-এর  বরাদ্দ আছে। সেই টাকায় গল্পের বই কেনার নিয়ম নেই। এই একটা গল্পে এসএলআইপির পুরো সংকটের চিত্র আমাদের সামনে চলে আসে। স্কুলকে বলা হয়েছে– তোমার উন্নতির পরিকল্পনা কর। কিন্তু কী কিনবে, কতটুকু কিনবে, কীভাবে কিনবে; সব কিছু ঠিক করে দেওয়া হয়েছে ঢাকা থেকে। 

শেখার মান ও অর্থায়নের ফাঁক
ইউনিসেফ ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় পিপিআরসির (পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার) সাম্প্রতিক গবেষণা একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে; বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় আমরা কতটুকু বিনিয়োগ করছি আর তার কতটুকু সত্যিকার শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাচ্ছে?
সংখ্যাটা ছোট নয়। প্রতিবছর এসএলআইপির মাধ্যমে প্রতিটি বিদ্যালয়ে বরাদ্দ যায়। ভ্যাট-আয়কর ইত্যাদির পর অনেক বিদ্যালয়ে ৩০ হাজার টাকার বরাদ্দের মধ্যে ব্যবহারযোগ্য টাকা থাকে ২২-২৩ হাজার। শিক্ষা অর্থনীতির গবেষণা একটি পরিষ্কার সত্য বলে– স্কুলে যাওয়া অর্থের পরিমাণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে এবং কখন হচ্ছে। হার্ভার্ডের গবেষক এরিক হানুশেক দেখিয়েছেন, শিক্ষায় বিনিয়োগ তখনই কার্যকর হয় যখন বিদ্যালয় সেই বিনিয়োগ ইচ্ছামতো খরচ করতে পারে।

সমাজের অংশগ্রহণ: দরজা খোলা, কিন্তু পথ বন্ধ
এসএলআইপির একটি মূল প্রতিশ্রুতি ছিল– সমাজ যুক্ত হবে। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক-শিক্ষক সমিতি, সামাজিক নিরীক্ষা কমিটি; এসব কাঠামো তৈরি হয়েছে। কিন্তু গবেষণা দেখাচ্ছে, এগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত। সভা হয়; স্বাক্ষর পড়ে। কেউ জানে না সিদ্ধান্ত কীভাবে হয়, কোথায় হয়। অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা সীমিত। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ অভিভাবক জানেনই না– এসএলআইপি কী। ব্রাজিলে ‘কনসেলহো এসকোলার’ বা স্কুল কাউন্সিলে অভিভাবকরা সত্যিকার অর্থে বাজেটে অগ্রাধিকার ঠিক করেন। ইন্দোনেশিয়ায় বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরিকল্পনা প্রকাশ্যে উপস্থাপিত হয়; সমাজের মতামতে তা সংশোধিত হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের অর্থবহ অংশগ্রহণের পথ এখনও তৈরি হয়নি।

ভ্যাট ও করের জটিলতা: একটি অদৃশ্য সংকোচন
যে বিষয়টি নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়, কিন্তু সমস্যা অনেক বড়, সেটি হলো ভ্যাট ও কর কর্তন। শিক্ষা উপকরণ কেনার সময় ভ্যাট দিতে হয়। এসএলআইপির বরাদ্দ থেকে আয়কর কাটা হয়। পরিবহন খরচ বিদ্যালয়ের। এই তিনটি মিলে প্রকৃত বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য অংশ শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানোর আগেই উধাও হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগকে কর থেকে মুক্ত রাখা একটি সাধারণ নীতি। বাংলাদেশে অন্তত এসএলআইপির বরাদ্দের ওপর ভ্যাট ও কর কর্তন পুনর্বিবেচনা করা দরকার। 

মূলভিত্তিক সাক্ষরতা: এসএলআইপি কি তৈরি আছে?
সরকারের শিক্ষা সংস্কার আলোচনায় এখন একটি ধারণা বারবার আসছে– ফাউন্ডেশনাল লার্নিং অ্যান্ড নিউমারেসি বা মূলভিত্তিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান, সংক্ষেপে এফএলএন। জাতিসংঘের এসডিজি-৪ এবং ইউনেস্কোর বৈশ্বিক শিক্ষা আলোচনায়ও এফএলএন কেন্দ্রস্থলে।
মূল কথাটা সহজ। শিশু যদি প্রাথমিক শেষ করে পড়তে, লিখতে আর গুনতে না শেখে, তাহলে বাকি শিক্ষা দুর্বল ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এই ভিতকেই শক্ত করতে হবে।
কিন্তু এসএলআইপির বর্তমান কাঠামোয় এফএলএনের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র নেই। এই যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। প্রতিটি এসএলআইপি পরিকল্পনায় তিন থেকে পাঁচটি সহজ সূচক যোগ করা যায়, কতজন শিক্ষার্থী দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণিতে স্বাচ্ছন্দ্যে পড়তে পারছে, উপস্থিতির হার কত, কতজন অনুপস্থিত থাকলে শিক্ষক বাড়িতে যোগাযোগ করছেন। 

প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতা: হাতের কাছের সুযোগ
বাংলাদেশে স্মার্টফোন এখন গ্রামেও সহজলভ্য। ইন্টারনেট পৌঁছেছে প্রত্যন্ত এলাকায়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আইপিইএমআইএস তথ্য ব্যবস্থায় স্কুলের অনেক তথ্য সংরক্ষিত হচ্ছে। এই পরিবেশে একটি এসএলআইপি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড তৈরি করা এখন আর কল্পনা নয়, বাস্তব সম্ভাবনা। সেই ড্যাশবোর্ডে থাকতে পারে– প্রতিটি বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, ব্যয়ের তথ্য, উপস্থিতির হার। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ডিজিটালি অনুমোদন দিতে পারবেন। 

জলবায়ু ও শিক্ষা: উপেক্ষিত সংযোগ
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে শত শত স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাঠদান বন্ধ থাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু এসএলআইপিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বরাদ্দ কমছে। বাংলাদেশের নিজের একটি অভিজ্ঞতা আছে–উপকূলে নির্মিত মাল্টিপারপাস সাইক্লোন শেল্টার-কাম স্কুল মডেল। এই অভিজ্ঞতাকে এসএলআইপির পরিকল্পনায় যুক্ত করা যায়। দেশের জ্ঞান, দেশের সমস্যা, দেশের সমাধান।

এম এম মুসা: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
 

আরও পড়ুন

×