ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মেধা পাচার যেসব আর্থসামাজিক ক্ষতি করছে

মেধা পাচার যেসব আর্থসামাজিক ক্ষতি করছে
×

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীরা বিদেশে গিয়ে নিজেদের মেধা কাজে লাগাতে বাধ্য হন।

সৈয়দ ফারুক হোসেন

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ১৫:১১

বাংলাদেশের বিশেষত মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অতি সম্প্রতি প্রক্রিয়াটি আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং চাকরির অধিকতর সুযোগের কারণে তারা দেশের বাইরে চলে যান এবং উচ্চশিক্ষা শেষে বেশির ভাগই আর দেশে ফিরে আসেন না। ফলে দেশ ক্রমশ মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে, যা অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য ভয়াবহ হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দেশের উন্নয়নের জন্য শিক্ষার এই ধারাবাহিক মেধা পাচার রোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, উন্নত জীবন ও উচ্চশিক্ষার আশায় গত দেড় দশকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের দেশত্যাগ বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে সিংহভাগ শিক্ষার্থীর জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে দেশত্যাগ। বিশ্বব্যাংকের জরিপ অনুযায়ী, বিগত এক দশকে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশে হিমশিম খান স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করা শিক্ষার্থীরা। এতে করে তাদের মধ্যে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা আরও ঊর্ধ্বমুখী। 

ব্রিটিশ কাউন্সিলের পরিচালনায় ‘নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ ২০২৪’ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৫৫ শতাংশেরই ইচ্ছা বিদেশে পাড়ি জমানো। জরিপে দেখা গেছে তরুণ বাংলাদেশিদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সৌদি আরব (২৭ শতাংশ), কানাডা (১৮ শতাংশ) ও অস্ট্রেলিয়া (১৩ শতাংশ)। এসব দেশকে আকর্ষণীয় হিসেবে দেখার প্রাথমিক কারণ হলো শিক্ষার সুযোগ (২৬ শতাংশ), ভাষা-ইতিহাস-সংস্কৃতি (২৫ শতাংশ), কাজের সুযোগ (২৩ শতাংশ) ও ধর্মীয় মিল (১৬ শতাংশ)। আবার ইউনেস্কোর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন মোট ৫২ হাজার ৭৯৯ জন শিক্ষার্থী। 

শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও তাদের উচ্চশিক্ষার পছন্দের দেশের তালিকায় রেখেছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া এবং জার্মানির মতো দেশগুলোকে। যথাক্রমে এসব দেশে পাড়ি জমিয়েছে মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকেরও বেশি। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ছয় হাজার ৫৮৬, কানাডায় পাঁচ হাজার ৮৩৫, মালয়েশিয়ায় পাঁচ হাজার ৭১৪ এবং জার্মানিতে পাঁচ হাজার ৪৬ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ ছেড়েছেন। ২০১৫ সালে ৬০ শতাংশ তরুণ মনে করতেন দেশ সঠিক পথে আছে। মূলত উন্নত দেশগুলোর মানসম্মত শিক্ষা, শিক্ষা পরবর্তী চাকরির বাজারে সহজে প্রবেশের সুযোগ এবং উন্নত জীবন ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু স্কলারশিপসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাই এসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের চাহিদা রয়েছে।

বাংলাদেশের তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। দেশে উচ্চমানের শিক্ষার অভাব, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং গবেষণার সুযোগ সীমিত হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা বিদেশের দিকে ঝুঁকছে। বিশেষত যারা পিএইচডি বা গবেষণা করতে চান, তারা দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বিদেশে উন্নত গবেষণার পরিবেশ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা সফলভাবে তাদের কাজ সম্পন্ন করতে পারেন, যা দেশে থাকা অবস্থায় সম্ভব হয় না।

এ ছাড়া দেশে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কঠিন। যারা দেশে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন, তাদের জন্য উপযুক্ত চাকরি পাওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং। অনেকেই সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকছেন, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিসিএস পেতে দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং প্রতিযোগিতার চাপ তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। বেসরকারি খাতে অনেকে চাকরি পেলেও মেধা অনুযায়ী বেতন এবং সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার কারণে তরুণদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে। এতে করে তারা মেধার সঠিক মূল্যায়ন বিদেশেই করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিদেশমুখী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমায় এবং সেখানে ভালো বেতনের চাকরি পেয়ে স্থায়ী হন। 

এই প্রক্রিয়া মেধা পাচার নামক সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীরা বিদেশে গিয়ে নিজেদের মেধা কাজে লাগাতে বাধ্য হন। এই মেধা পাচারের কারণে দেশের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, কারণ যারা দেশের জন্য সম্পদ হতে পারত, তারা বিদেশে গিয়ে অন্য দেশকে উপকৃত করছে। এদিকে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়ার প্রবণতা অনেক পরিবারের মধ্যেও তৈরি হয়েছে। পরিবারের মধ্যবিত্ত শ্রেণির সদস্যরা, যারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, সন্তানকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ পাঠাতে চান, তাদের বিশ্বাস, বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। তারা ধার-কর্জ করে হলেও সন্তানকে বিদেশ পাঠান এবং আশাবাদী থাকেন যে সন্তান দেশে ফিরে এসে তাদের সাহায্য করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বিদেশে স্থায়ী হয়ে যান এবং দেশে ফিরতে চান না। 

দেশের উন্নয়নের জন্য মেধাশূন্যতা থেকে মুক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে তুলতে হবে এবং মেধাবীদের দেশের জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দেশের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের জন্য মেধা পাচার রোধ করতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে। 
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা রোধে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধি, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার মাধ্যমে মেধা পাচার বন্ধ করা সম্ভব। আগামী প্রজন্মের হাতে একটি উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ উপহার দিতে হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। সে জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে।

সরকারকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের জন্য দেশে উচ্চমানের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা দেশে থেকে নিজেদের মেধা কাজে লাগাতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এবং গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে স্থান করে নিতে হবে, যাতে বিদেশি শিক্ষার্থীরাও এখানে এসে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হয়। মেধা পাচার রোধ করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ দ্রুতই একটি উন্নত এবং স্থিতিশীল দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে, যা কেবল আমাদের জন্য নয়, সারাবিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

সৈয়দ ফারুক হোসেন: কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (জাবিপ্রবি)
 

আরও পড়ুন

×