ইসলাম ও সমাজ
হিজরি নববর্ষের তাৎপর্য
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৭:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘সানাহ ক্বামারিয়্যাহ’ বা চান্দ্রবর্ষের প্রথম দিন ১ মহরম। একে আমরা হিজরি নববর্ষ বলি। ১ জানুয়ারির মতো ধুমধাম নেই। আছে গভীর ভাবনা, আত্মজিজ্ঞাসা, ফিরে দেখার আহ্বান। পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবার ৩৬ আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধানে মাসের সংখ্যা বারো’। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত: জিলকদ, জিলহজ, মহরম ও রজব।
হিজরি সন শুরু হয় রাসুলে পাক (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনা দিয়ে। কিন্তু হিজরতের তারিখ ১ মহরম ছিল না। হিজরত হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসে। তাহলে ১ মহরমকে বছরের শুরু ধরা হলো কেন?
খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর সময়ে সাহাবায়ে কেরাম পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন। তারা জন্ম, মৃত্যু বা বিজয়কে নয়; একটি ত্যাগের ঘটনাকে মুসলিম জাতির ‘শূন্য সাল’ বানালেন।
এখানেই হিজরি সনের মর্মকথা। হিজরত মানে ঘরবাড়ি ছাড়া নয়। হিজরত মানে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য সব মায়া ত্যাগ করা। মক্কার কাবা, নিজের জন্মভূমি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব রেখে ইমানের টানে মদিনার পথে পা বাড়ানো।
হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। ‘মহরম’ শব্দের অর্থ সম্মানিত, নিষিদ্ধ। জাহেলি যুগেও আরবরা এই মাসে যুদ্ধ বন্ধ রাখত।
১০ মহরম আশুরা। এই দিনে মহান আল্লাহ হজরত মুসা (আ.)-কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দেন। রাসুলে পাক (সা.) মদিনায় এসে ইহুদিদের রোজা রাখতে দেখে নিজেও রোজা রাখলেন। বললেন, ‘আমি মুসা (আ.)-এর পথের বেশি হকদার’ (সহিহ বুখারি)।
কারবালার ঘটনাও এ মাসেই। ৬১ হিজরির ১০ মহরম হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) সপরিবারে শাহাদাত বরণ করেন। ক্ষমতার লোভে ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে মাথা নত করেননি তিনি। সংখ্যায় ৭২ জন হয়েও ৩০ হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই হিজরি নববর্ষের প্রথম মাসই আমাদের দুটি শিক্ষা দেয়। এক. আল্লাহর সাহায্য চাইলে ধৈর্য ধরতে হয়; হজরত মুসা (আ.)-এর মতো। দুই. অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে হয়; হজরত হুসাইন (রা.)-এর মতো। ইবাদতের অনেক বিধান হিজরি তারিখের সঙ্গে যুক্ত। রমজানের রোজা, জিলহজের কোরবানি, আশুরার রোজা– সবই চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। হিজরি সন না জানলে ইবাদতের সময়ও ঠিক রাখা যাবে না।
নববর্ষে আমাদের করণীয়:
১. হিসাবের দিন: বছরের শেষে ব্যবসার হিসাব মেলাই। হিজরি নববর্ষে নিজের আমলের হিসাব মেলানো দরকার। কত ওয়াক্ত নামাজ কাজা গেল? কত টাকা সুদ খেলাম? কতবার মিথ্যা বললাম? রাসুলে পাক (সা.) বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হিসাব নাও, আল্লাহর সামনে হিসাব দেওয়ার আগে’– (তিরমিজি)।
২. নতুন সংকল্প: ১ জানুয়ারিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিই– জিমে যাব, ডায়েট করব। ১ মহরমে সংকল্প নিই– নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ব, সপ্তাহে দুটি রোজা রাখব, প্রতিদিন ১০ টাকা সদকা করব। অল্প আমল, কিন্তু নিয়মিত করব।
৩. উম্মাহর একতা: হিজরি সন মুসলিম বিশ্বের অভিন্ন ক্যালেন্ডার। আজ গাজা, কাশ্মীর, আরাকানে মুসলিম নির্যাতিত। হিজরি নববর্ষে তাদের জন্য দোয়া করা আমাদের দায়িত্ব। উম্মাহর ব্যথায় ব্যথিত হওয়াই ইমানের দাবি।
৪. পরিবারে চর্চা: সন্তানদের হিজরি মাসের নাম শেখান। চাঁদ দেখা শেখান। ১ মহরমে পরিবারের সবাই মিলে দুই রাকাত শোকরানা নামাজ পড়ুন। আল্লাহ নতুন বছর দিলেন; এর শুকরিয়া আদায় করুন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিজরি সনের বরকত দান করুন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার