ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

ছিনতাইকারীর হস্তে নারীর মৃত্যু

গভীর জননিরাপত্তা সংকট

গভীর জননিরাপত্তা সংকট
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীতে ছিনতাইকারীর হস্তে পুনরায় এক নারীর মৃত্যু ঘটিল। শনিবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রবিবার রিকশায় ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রবেশপথ অতিক্রমকালে মোটরসাইকেল আরোহী দুই ছিনতাইকারীর একজন তাঁহার ব্যাগ টানাটানি করিলে ঐ নারী সড়কে পড়িয়া মাথায় আঘাত পান। হাসপাতালে ভর্তির চার দিন পর বৃহস্পতিবার তিনি প্রাণ হারাইয়াছেন। ঘটনাটি বেদনাদায়ক তো বটেই; আইনশৃঙ্খলার সামগ্রিক অবনতিকেও তুলিয়া ধরে বলিয়া আমরা মনে করি। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য মতে, জানুয়ারি হইতে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ঢাকাসহ সমগ্র দেশে চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনায় তিন সহস্র ৮৯৯টি মামলা হইয়াছে। এই সময়ে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ঢাকা ও ঢাকার বাহিরে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনাও ঘটিয়াছে। এমনকি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে দায়িত্ব পালনকালে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে পুলিশের দুই সদস্য আহত হইয়াছেন। ইতোপূর্বে ছিনতাইকারীর হস্তে র‍্যাব সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটিয়াছে। এত অঘটনের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চৈতন্যোদয় হইয়াছে, বলা যায় না।

গত মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়া জানানো হইয়াছে, ঢাকায় তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা এক সহস্র ৩৮৭। পুলিশ কর্তৃপক্ষ দাবি করিয়াছেন, উক্ত তালিকা ধরিয়া তাহাদের গ্রেপ্তার অভিযান চলিতেছে। অনেককে আটকও করা হইয়াছে। এতৎসত্ত্বেও ছিনতাইসহ নানাবিধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসিতেছে না। বস্তুত দায়িত্ব পালনে পুলিশের আন্তরিকতার ঘাটতিই এহেন পরিস্থিতির জন্ম দিয়াছে। রাজধানীতে সম্প্রতি সংঘটিত একাধিক ছিনতাইয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করিয়া মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে সমকাল জানাইয়াছে, ছিনতাইকারীর আঘাতে খুন কিংবা গুরুতর আহত না হইলে ভুক্তভোগীরা থানার চৌকাঠ অবধি যাইতে এবং মামলার ন্যায় ঝামেলাপূর্ণ কার্যে সংশ্লিষ্ট হইতে চাহেন না। অনেক ক্ষেত্রে থানাও মামলা গ্রহণ করে না। সাধারণ ডায়েরি নথিভুক্ত করিয়া ভুক্তভোগীকে নিষ্ক্রান্ত হইতে বলা হয়। ইহা সত্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বিক্ষোভকারীদের একটা অংশের দ্বারা ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হইয়া পুলিশ বিভাগ পর্যুদস্ত হইয়া পড়িয়াছিল। এমনকি দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় মনোবলও হারাইয়া ফেলিয়াছিল। ইতোমধ্যে অনেক সময় অতিক্রান্ত। অনেক বিক্ষোভ দমনে পুলিশকে বেশ সক্রিয়ও হইতে দেখা গিয়াছে। এমনকি বিনা কারণে সাধারণ মানুষকে পুলিশের হয়রানি করার অনেক ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে আসিয়াছে। অতএব, দুই বৎসর পূর্বের ট্রমার কথা বলিয়া বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলার কোনো সুযোগ নাই। 

নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাপন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চলাচলের স্বাধীনতা যখন অপরাধীদের ভয়ে ব্যাহত হইতে শুরু করে, তখন উহা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যবসা-বাণিজ্য তথা সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সন্দেহ নাই, চুরি-ছিনতাই-ডাকাতি রাজধানী বা অন্যত্র নূতন অপরাধ নহে। তবে অতীত সরকারের ব্যর্থতা এই ক্ষেত্রে কোনো ন্যায্যতা জোগায় না। তদুপরি স্বীকার করিতে হইবে, সকল পরিসংখ্যান অনুসারে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার সুযোগে দেশে অপরাধকর্মের যে ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটিয়াছিল, অদ্যাবধি তাহা নিয়ন্ত্রণে আসে নাই। এই প্রকার অপরাধ বৃদ্ধির পশ্চাতে অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, সামাজিক অবক্ষয়ও কম দায়ী নহে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পাইলে তাহা অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে আসিত।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী যদিও সাম্প্রতিক কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করা হইয়াছে, তাহা যথেষ্ট নহে। ছিনতাই প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ের ইউনিটগুলির সক্রিয়তা বৃদ্ধি করিতেই হইবে। ছিনতাইকারীর হস্তে নিহত নারীর স্বজনদের ন্যায়বিচার দিতে হইলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হইতে হইবে। মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা সর্বাগ্রে। উহা নিশ্চিত না হইলে উন্নয়ন, বিনিয়োগ কিংবা সামাজিক স্থিতিশীলতা; কোনোটিই টেকসই হইবে না। তাই এহেন পরিস্থিতিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে বিবেচনা না করিয়া জননিরাপত্তার গভীর সংকটরূপে চিহ্নিত করা হইবে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। 

আরও পড়ুন

×