ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

স্বাস্থ্য

ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা হবে স্বাস্থ্য খাতের বড় চ্যালেঞ্জ

ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা হবে স্বাস্থ্য খাতের বড় চ্যালেঞ্জ
×

শরীয়তুল্লাহ খান

শরীয়তুল্লাহ খান

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৪ | আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

হামের প্রকোপের মধ্যেই বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যুর হার কিছুটা কমলেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর মধ্যেই বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের প্রতিটি হুমকি শুরুর পর আমরা তথ্য বিশ্লেষণ করি, কোন কোন গাফিলতির জন্য এমন হয়েছে। ততদিনে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী রূপ  জ্বরের সঙ্গে রক্তক্ষরণের (ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার) মাত্রা বেশি হতে পারে। তাই প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

১৯৬০-এর দশকে ঢাকা শহরে যে নতুন এক ধরনের জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে এর নামকরণ হয়েছিল ‘ঢাকা জ্বর’। বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ জ্বর, মাথাসহ পুরো শরীরে তীব্র ব্যথা এবং কয়েক দিন পর সুস্থ হয়ে যাওয়া। এই জ্বর দীর্ঘদিন কম ক্ষতিকর হিসেবেই ছিল। পরে এ জ্বরের কারণ হিসেবে ডেঙ্গু ভাইরাস চিহ্নিত হয়। সেই নিরীহ জ্বরই একসময় হয়ে উঠল প্রাণঘাতী। বাংলাদেশে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতি, মানুষের অসচেতনতায় এডিস মশার বিস্তারে ২০০০ সালে দেশ প্রথম মুখোমুখি হয় ডেঙ্গু মহামারির। তবে ডেঙ্গু নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা ২০২৩ সালে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন জানিয়েছে, ওই বছর আক্রান্ত হয়েছে তিন লাখের বেশি মানুষ। প্রাণ হারিয়েছে এক হাজার ৭০০ জনের বেশি। ২০২৫ সালে আক্রান্ত এক লাখের বেশি; মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। এ শুধু মানুষ হারানোর তালিকা নয়; দেশের মানবসম্পদও ঝুঁকিতে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডেঙ্গু এখন ‘বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য হুমকি’। 

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ হচ্ছে মশা নিয়ন্ত্রণ। এ জন্য সবার আগে নজর দিতে হবে পরিকল্পিত নগরায়ণের দিকে। এ ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনাবিদের সহায়তা নিতে হবে এবং নগরায়ণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় দপ্তরগুলোকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

এডিশ মশা যেহেতু পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে, তাই যে কোনো জায়গায় সাত দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানির উৎস ধ্বংস করতে হবে।
ব্যক্তি পর্যায়ে মশার কামড় থেকে বাঁচতে হলে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন– এমন কাপড় পরিধান করা, যেটা শরীরের অধিকাংশ অংশ আবৃত করে রাখে; মশা নিরোধক ক্রিম, স্প্রে ব্যবহার; মশারি টাঙানো, বিশেষ করে দিনের বেলায় বিশ্রাম নেওয়ার সময়।

জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একটি চমৎকার উদ্যোগ নিয়েছে– প্রতি মাসের প্রথম শনিবার দাপ্তরিকভাবে ‘ক্লিনিং ডে’ ঘোষণা। এ কর্মসূচি সফল করতে হলে সব রাজনৈতিক দল, এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সর্বোচ্চ জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, এমনকি ইউনিয়নকেও এ কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। কারণ ডেঙ্গু এখন আর কোনো শহুরে রোগ নয়। এর বিস্তার গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এই আন্তর্জালের যুগে আমাদের জনসচেতনতামূলক প্রচারে জোর দিতে হবে। টেলিভিশন, বেতার, ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রামসহ সব সামাজিক মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচার বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব রোগীর চিকিৎসার সময় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। সংকটময় মুহূর্তে কিছু অসাধু চক্র পরীক্ষা ও চিকিৎসা সামগ্রীর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে

জনদুর্ভোগ সৃষ্টি 
করে। তাই সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে।
বিভাগীয় ও জেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে উপজেলা হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ের কিট অব্যাহতভাবে সরবরাহ রাখলে রোগ নির্ণয় সহজ হবে। যেহেতু এসব কিট আমদানিনির্ভর, তাই সরকারকে এখনই আমদানি করে যথাযথ মজুত নিশ্চিত করতে হবে।

বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, ডেঙ্গু জ্বরে ব্যবহৃত জীবন রক্ষাকারী স্যালাইনের (নরমাল স্যালাইন) সংকটের কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাপক ব্যাহত হয়েছে। তাই যথাযথ সমীক্ষার মাধ্যমে প্রাক্কলন করে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বজায় রাখতে ঔষধ প্রশাসনসহ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য দপ্তরকে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।   
অনেক ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জ্বরের কারণে রক্তক্ষরণজনিত রোগীদের ক্ষেত্রে প্লাটিলেট কনসেনট্রেইটের (ঘনীভূত অণুচক্রিকা) প্রয়োজন পড়ে। ব্যয়বহুল এ প্রক্রিয়ার জন্য বাংলাদেশে এ ধরনের মেশিনের সংখ্যা খুব কম। ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগে এ ধরনের আধুনিক মেশিন ক্রয় করে জটিল ডেঙ্গু রোগীদের আধুনিক চিকিৎসা প্রদান করতে পারলে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুহার অনেক কমানো সম্ভব।  
ডেঙ্গু জ্বরের ধরনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের কারণে রক্তক্ষরণ এবং ডেঙ্গু জ্বরের সঙ্গে শক, এ দুটি ধরন হচ্ছে ভয়াবহ এবং অনেক সময় জীবন হরণকারী। এ ধরনের রোগীর জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রয়োজন হতে পারে।

কভিড-১৯ মহামারি এবং হামের প্রকোপের সময় সারাদেশে আমাদের আইসিইউ বেডের দৈন্যদশার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। তাই স্বাস্থ্যসেবাকে ঢাকা থেকে বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে প্রতিটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ শয্যাসংখ্যা বাড়াতে হবে। 

সাধারণ রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হলে বিদ্যমান হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার নির্ধারণসহ অস্থায়ী হাসপাতাল বানানোর প্রস্তুতিও রাখতে হবে। কভিড-১৯-এর মতো ডেঙ্গু হাসপাতালগুলোতেও যথাযথ ট্রায়াজ সিস্টেম চালু করতে হবে। ডেঙ্গু রোগীকে শুরুতেই কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ফেলতে হবে। কিছু রোগী আসে যাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় না। তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নিতে পারবে। কিছু রোগী আসে যাদের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন, তারা হাসপাতালের সাধারণ বিছানায় ডাক্তার ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে থাকবে। এর পর কিছু রোগী থাকবে যাদের আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন। আর এক শ্রেণির রোগীর বিশেষ যত্নের প্রয়োজন পড়ে। এদের মধ্যে রয়েছে শিশু এবং বৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বা এবং জটিল ও একাধিক রোগে আক্রান্ত (হার্ট ফেইলর, কিডনি ফেইলর, লিভার ফেইলর, স্ট্রোক, অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস) রোগী।

এভাবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভাগ করে আমাদের অপ্রতুল স্বাস্যসেবা সামগ্রীকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আইসিইউ পরিচালনা বা ট্রায়াজ সিস্টেমকে সফল করতে হলে প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত দক্ষ জনশক্তি। তাই জনস্বার্থে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কর্মরত চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান করে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।  
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, সামনে ডেঙ্গুর সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশন এককভাবে সফল হতে পারবে না। প্রয়োজন সর্বোচ্চ জনসম্পৃক্ততা এবং প্রকোপ শুরুর পর এ বিষয়ে সচেতনতার চেয়ে প্রস্তুতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

ডা. শরীয়তুল্লাহ খান: কনসালট্যান্ট, মেডিসিন 
 

আরও পড়ুন

×