সমাজ
তর্কপ্রিয় ভারতীয়দের শোনাটাও শিখতে হবে
শশী থারুর
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
চীনা গবেষক কেজি মাও-এর সাম্প্রতিক পোস্টে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা উঠে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া সে পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘চীন কীভাবে তার শিল্প ও প্রযুক্তিগত বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলে, সে বিষয়ে আমি দুটি বিষয় তুলে ধরেছিলাম। এর একটি ভারতীয় শ্রোতাদের জন্য এবং অন্যটি ভিয়েতনামি শ্রোতাদের জন্য। যদিও বিষয়বস্তু ছিল আদতে একই, কিন্তু ভিয়েতনামি ও ভারতীয়দের প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষণীয়ভাবে ভিন্ন।’
তিনি লেখেন, ‘যখন আমি ভিয়েতনাম ও চীনের মধ্যকার ব্যবধান নিয়ে আলোচনা করছিলাম, আমার ভিয়েতনামি বন্ধুরা ভিয়েতনামের দুর্বলতা নিয়ে আমার বিশ্লেষণ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। এমনকি তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভিয়েতনামের ঘাটতিগুলো স্বীকার করে নিয়েছিল এবং আমাকে আরও নির্দিষ্ট কিছু বিষয় বিস্তারিত বিশ্লেষণ করতে বলেছিল। কিন্তু যখন আমি চীন ও ভারতের মধ্যে তুলনা করলাম, অনেক ভারতীয় বন্ধু বেশ তর্কে জড়িয়ে গেল। তারা প্রায় প্রতিটি বিষয়েই চীনা দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা সেটিকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করছিল। ফলে আমি আমার বিশ্লেষণ নিয়ে এগোতেই পারছিলাম না। এর মধ্য দিয়ে তারা হয়তো বিতর্কে জিতেছে, কিন্তু একটি অর্থপূর্ণ আলোচনার মূল্যবান সুযোগ হারিয়েছে।’
তিনি যোগ করলেন, ‘আমি বহু বছর আগেই জেনেছিলাম ‘চীন+১ (বিশ্বমঞ্চে চীনের উত্থানের সঙ্গী)’-এর জন্য আসল বিজয়ী কোন দেশ হবে।’
এই বিষয়টি বুদ্ধিজীবী ও কূটনৈতিক মহলে প্রায়ই দেখা যায়, যা অস্বস্তিকর হলেও প্রয়োজনীয় বাস্তবতা তুলে ধরে। এটি কানাডার প্রয়াত রাষ্ট্রদূত ডেভিড ম্যালনের একটি পর্যবেক্ষণের প্রতিধ্বনি, যিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন, ভারতীয় কূটনীতির একটি বড় ব্যর্থতা হলো, এর অনুশীলনকারীরা ‘বন্ধু বানানোর চেয়ে তর্কে জেতায় বেশি পারদর্শী।’ এটি শুধু আমাদের কূটনীতিকদের সমালোচনা নয়; এটি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর ভাষ্যও বটে।
ভারতীয় ইতিহাস সম্বাদের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ, যাকে বলা যায় দ্বান্দ্বিক বিতর্কের শিল্প। প্রাচীন ভারতীয় চিন্তাবিদরা কঠোর বিতর্কের মাধ্যমে সমৃদ্ধি লাভ করেছিলেন, যেখানে লক্ষ্য ছিল প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করে উচ্চতর সত্যে উপনীত হওয়া। এই প্রেক্ষাপটে তর্ক-বিতর্ককে একটি পুণ্যময় সাধনা, জ্ঞানের আঁতুড়ঘর হিসেবে দেখা হতো। তবে আধুনিক যুগে বিতর্কের প্রতি এই সাংস্কৃতিক প্রবণতা তর্কসাপেক্ষে একটি লোক দেখানো প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত। যখন লক্ষ্য সংশ্লেষণ বা অন্যের কাছ থেকে শেখা থেকে বিজয়ে বা অন্যকে পরাজিত করায় স্থানান্তরিত হয়, তখন ‘সম্বাদ’-এর চেতনা হারিয়ে যায়। আমরা প্রায়ই এই আলোচনাকে সেতুবন্ধের প্রচেষ্টা হিসেবে না দেখে অপর পক্ষকে হারানোর একটি খেলা হিসেবে দেখি, যেখানে কোনো একটি বিষয়ে ছাড় দেওয়াকে বুদ্ধিবৃত্তিক বা জাতীয় মর্যাদার আত্মসমর্পণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
এ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের বাইরেও একটি আরও সমসাময়িক মনস্তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি রয়েছে। সেটি হলো এক গভীর, প্রায়ই অবচেতন, আত্মরক্ষামূলক নিরাপত্তাহীনতা। ভারত এমন একটি দেশ, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ঔপনিবেশিক শাসন এবং তার ফলস্বরূপ বিশ্বমঞ্চে স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে এসেছে। এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানকে বৈধতা দেওয়ার এক ব্যাপক প্রয়োজন তৈরি করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের প্রায়ই পৃষ্ঠপোষকতামূলক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পশ্চিমা সমালোচনার বিরুদ্ধে আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে রক্ষা করতে হয়েছে।
ফলে একটি বদ্ধমূল সন্দেহ রয়েছে, বিদেশি অন্তর্দৃষ্টিগুলো বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ নয়; বরং ভূ-রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বৃহত্তর খেলার কৌশলগত চাল মাত্র। যখন কোনো বহিরাগত, বিশেষ করে যিনি কোনো প্রতিযোগী শক্তি বা ভিন্ন উন্নয়ন মডেলের প্রতিনিধিত্ব করেন– কোনো সমালোচনা করেন, তখন সেটিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রায়ই বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের পরিবর্তে আক্রমণ হিসেবেই গ্রহণ করা হয়।
দেশের ভাবমূর্তি এবং আলোচকের অহং রক্ষা করার জন্য বয়ান ঘুরিয়ে দেওয়া, প্রতিহত করা এবং তাতে আধিপত্য বিস্তারের একটি প্রবণতা কাজ করে। তাই কেজি মাও-এর মতো একজন চীনা পণ্ডিত যখন ভারতের শিল্প পরিকাঠামোর সমালোচনা করেন, তখন তা একটি নিরপেক্ষ শিক্ষা হিসেবে গৃহীত হয় না; বরং ‘শ্রেষ্ঠ’ চীন এবং তুলনামূলক মূল্যায়নের একটি তথ্যসূত্র হিসেবে গণ্য হয়। ভারতীয় আলোচকদের মনে, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি গ্রহণ করা মানেই হীনম্মন্যতার অবস্থানকে মেনে নেওয়া। ভারত যখন একটি বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজের স্থান প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, তখন আমাদের নিজেদের চোখে যেমন, তেমনিভাবে ‘দেখিয়ে’ দেওয়ার প্রবণতা কাজ করে। একই সঙ্গে যখন আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচকভাবে বিচার করা হয়, তখন ‘ভুল শুধরে দেওয়ার’ এক তীব্র উদ্বেগ দেখা দেয়।
একুশ শতকের জটিল ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্রোতধারায় ভারত যদি সফলভাবে এগোতে চায়, তাহলে একটি বিষয় জরুরি। বিশেষ করে ‘চায়না+১’ কৌশলের মতো উদ্যোগগুলোর ক্ষেত্রে ভারতকে যদি সফলভাবে পথ চলতে হয়, তবে আমাদের অবশ্যই আলোচনার প্রাণবন্ত ঐতিহ্যের সঙ্গে বাস্তববাদী উন্মুক্ততার সমন্বয় ঘটাতে হবে। শেষ পর্যন্ত কোনো বিতর্কে জেতার ক্ষণস্থায়ী সন্তুষ্টির চেয়ে বন্ধু তৈরি করা এবং অন্তর্দৃষ্টি লাভ করার ক্ষমতা আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রার জন্য অনেক বেশি মূল্যবান।
শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র
প্রতিমন্ত্রী; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- শশী থারুর
