কূটনীতি
দীনেশ ত্রিবেদীর আগমন ও বক্তব্য যে ইঙ্গিত দিচ্ছে
ফয়সাল মাহমুদ
ফয়সাল মাহমুদ
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ | ১১:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বিমানে না এসে বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। কূটনৈতিক মহলে এ সিদ্ধান্তকে একটি প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সংযোগ ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা এতে ছিল বলে মনে করা হয়।
ঢাকায় পৌঁছে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ত্রিবেদীও প্রচলিত কূটনৈতিক ভাষার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের যা পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি। তার সঙ্গে ২০ কোটি অ্যাড করেছি। ১৬০ কোটি। আমি এখানে যা করতে চাই, তা সব একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে ভাবছি না। আমার মনে হচ্ছে না যে, আমি বাংলাদেশে। দেখছেন না আমি হেঁটে চলে এসেছি। একই আকাশ, একই বাতাস’ (সমকাল, ১৩ জুন, ২৬)।
ভিসা সংক্রান্ত বিষয়েও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা একসঙ্গে ভিসা সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমাধান করব। আমাদের শুধু অভিন্ন সীমান্ত নয়, অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের চ্যালেঞ্জগুলোও এক।’
আরেকটি বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাই-বোন। মানুষের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
একজন পেশাদার কূটনীতিকের তুলনায় একজন রাজনীতিকের ভাষা ও উপস্থাপনা সাধারণত ভিন্ন হয়। ত্রিবেদীর বক্তব্যে সেই রাজনৈতিক পটভূমির প্রভাব স্পষ্ট। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলোর বড় অংশই রাজনৈতিক।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, বিশেষত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দুই দেশের সম্পর্ক একটি জটিল সময় অতিক্রম করেছে। পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি বেড়েছে। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে অচলাবস্থা রয়ে গেছে। সীমান্ত পরিস্থিতি ও ‘পুশইন’ বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুই দেশের সরকারের সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যও অনেক সময় সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি দিয়ে সম্পর্কের সব জটিলতা মোকাবিলা করা কঠিন। সম্ভবত এ কারণেই নয়াদিল্লি এবার ঢাকায় একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায়, ভারত বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিতেও দেখছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনীতির ভূমিকা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, অভিবাসন প্রশ্ন, সীমান্ত পরিস্থিতি কিংবা জাতীয়তাবাদী বয়ান– সবকিছুই দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে। ফলে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার গুরুত্বও বেড়েছে।
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও জনসম্পৃক্ততামূলক কর্মসূচির আয়োজন করেছে। শাড়ি প্রদর্শনী, খাদ্য উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তুলে ধরতে ভূমিকা রেখেছে। এসব উদ্যোগের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব প্রশ্ন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে, সেগুলোর বেশির ভাগই রাজনৈতিক ও নীতিগত। ফলে সাংস্কৃতিক কূটনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্কের যে চরম অবনতি ঘটেছিল, পরবর্তী পর্যায়ে তা একই ধারায় না থাকলেও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। এর একটি কারণ হতে পারে রাজনৈতিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা এখনও যথেষ্ট না হওয়া। অবশ্য ইতোমধ্যে– গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারত সফর করেছেন। তাদের সমপর্যায়ের ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই সফরের সময় হুমায়ুন কবির, যিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিবও বটে, প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি ‘বিশেষ চিঠি’ ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীনের কাছে হস্তান্তর করেছেন। এই চিঠি তখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ বাড়ানোরএকটি নতুন উদ্যোগ হিসেবে কূটনৈতিক মহলে বিবেচিত হয়েছিল।
দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ এবং বাংলাদেশে প্রবেশ করেই প্রদত্ত তাঁর বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট– ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দিতে চাইছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও একই ধরনের বাস্তববাদী উদ্যোগ প্রয়োজন। এর অর্থ শুধু ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো নয়। রাজনৈতিক দল, সংসদ সদস্য, অঙ্গরাজ্য সরকার, নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও জনমত গঠনে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যেমন পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কিংবা অভিবাসন প্রশ্ন মূলত রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই অগ্রসর হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক সংলাপ, আস্থা এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা।
বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক কূটনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক কূটনীতিকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।
ফয়সাল মাহমুদ: সাংবাদিক
- বিষয় :
- কুটনীতিক
