ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

বাজেট

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষার সুযোগ নেই

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষার সুযোগ নেই
×

মামুন রশীদ

মামুন রশীদ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ | ১১:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনের পর প্রথম বাজেট সাধারণত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ এর মধ্য দিয়েই নতুন সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের রূপরেখা তুলে ধরে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটও সেই অর্থে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা বহন করছে। বিদায়ী বছরের মূল বাজেট থেকে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের এ বাজেটকে স্বাভাবিকভাবেই উচ্চাভিলাষী বলা হচ্ছে। এই উচ্চাভিলাষী হওয়ায় হয়তো দোষ নেই, তবে বর্তমান বাস্তবতায় তা যে বেশ বড়, তাতে সন্দেহ নেই। 

অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে তুলনায় নতুন বাজেটের আকার প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ব্যয় বাড়ানোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়ের উৎস কি সরকার নিশ্চিত করতে পারবে?

আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। বাস্তবতা হলো, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ৫ লাখ কোটি টাকাও অতিক্রম করতে পারবে না বলে খোদ অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। অর্থাৎ প্রকৃত আদায় এবং আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ব্যবধান দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি হলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।

আরও উদ্বেগের বিষয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের প্রকৃত আদায় ছিল মাত্র ৩ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সংস্থাটির রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই বাস্তবতায় রাজস্ব আদায়ে প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলে মনে হয়।

সমস্যা শুধু রাজস্বে নয়। বাজেটের ব্যয় কাঠামোও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ অবশ্যই একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। উপরন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, বরাদ্দ বাড়ানো সবসময় উন্নত সেবা নিশ্চিত করে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের তুলনায় বাস্তবায়নের সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে সীমিত। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নতুন বরাদ্দের কার্যকরতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। একই সঙ্গে কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে উঠছে।

একই সময়ে সরকারকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের ভর্তুকির চাপ বহন করতে হবে। কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ রয়েছে। ফলে একদিকে ভর্তুকি ব্যয়, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয়; দুই দিক থেকেই সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়বে।

অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে সরকার দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। এখানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। ব্যাংক খাত থেকে বেসরকারি উদ্যোগে ঋণ ইতোমধ্যে অনেক নিচে নেমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ২০ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি যেখানে বেসরকারি খাত, সেখানে ঋণের এ খরা শিল্পোৎপাদন, কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে অবধারিতভাবেই নিম্নমুখী করে তুলবে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং বাংলাদেশের ঋণমান কমে যাওয়া বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। একই সময়ে যদি সরকার সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি গ্রহণ করে, তাহলে নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়বে।
বাজেটের সাফল্য কখনোই তার আকার দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য, সঠিক প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতাই একটি বাজেটের কার্যকরতা নির্ধারণ করে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও উপেক্ষা করা যায় না।

সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত হলো টেকসই অর্থায়ন। রাজস্ব সংগ্রহে মৌলিক সংস্কার, ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে এই বৃহৎ বাজেট অর্থনীতির জন্য প্রত্যাশিত সুফলের পরিবর্তে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাজেট ঘোষণা নয়, বরং এর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, বরাদ্দের অভাবে নয়, বরং দুর্বল পরিকল্পনা, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে অনেক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। ফলে আগামী বাজেটে অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে 
বিবেচিত হবে।

নতুন সরকার নতুন সমাধান আর নতুন আশা নিয়ে এগিয়ে যাবে, তাতে সমস্যা নেই। তবে তাদের কোমরের বেল্টকেও কষে লাগাতে হবে। সঙ্গে থাকবে সবার একই টিম হয়ে কাজের দৃঢ় ইচ্ছা।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×