ইসলাম ও সমাজ
মহররমের আমল
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৮:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
হিজরি নববর্ষের প্রথম মাস মহররম। আল্লাহতায়ালা যে চারটি মাসকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন, মহররম তার অন্যতম। পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবার ৩৬ আয়াতে এরশাদ হয়েছে: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারোটি... তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। সুতরাং এ মাসগুলোতে তোমরা নিজেদের ওপর জুলুম করো না।’ অর্থাৎ গুনাহ করে নিজের ক্ষতি করো না। হাদিস শরিফে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ নামে অভিহিত করেছেন (সহিহ মুসলিম)। কোনো মাসকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করা তার বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ।
মহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আরবি ‘আশারা’ শব্দ থেকে আশুরা, যার অর্থ ১০। আশুরার রোজার ফজিলত: হাদিসে বর্ণিত, রাসুলে কারিম (সা.)কে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, এটি পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মোচন করে দেবে’ (সহিহ মুসলিম)।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলে কারিম (সা.) মদিনায় এসে ইহুদিদের আশুরার দিন রোজা রাখতে দেখেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটি কী?’ তারা বলল, ‘এটি একটি মহান দিন। এই দিনে মহান আল্লাহ হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দেন এবং ফেরাউনকে তার দলবলসহ ডুবিয়ে মারেন। তাই হজরত মুসা (আ.) শুকরিয়াস্বরূপ এই দিনে রোজা রাখেন। আমরাও রাখি।’ তখন হজরত রাসুলে কারিম (সা.) বললেন, ‘হজরত মুসা (আ.)-এর অনুসরণে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার’ (সহিহ বুখারি)। এরপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রাখার নির্দেশ দেন।
ইহুদিরা শুধু ১০ মহররম রোজা রাখত। তাদের বিরোধিতা করার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো এবং এর এক দিন আগে বা এক দিন পরে রোজা রেখে ইহুদিদের বিরোধিতা করো’ (মুসনাদ আহমাদ)।
সুতরাং সুন্নাত হলো ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মোট দুই দিন রোজা রাখা। মহররম সম্মানিত মাস। এ মাসে গুনাহর শাস্তি যেমন বাড়ে, তেমনি নেক আমলের সওয়াবও বৃদ্ধি পায়। ইমাম গাজালি (র.) বলেন, হজরত আদম (আ.)-এর তাওবা এ মাসেই কবুল হয়েছিল (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন)। তাই বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করা উচিত। সালফে সালেহিন মহররম মাসে দান-সদকা করতে পছন্দ করতেন। গরিব-দুঃখী ও এতিমদের সাহায্য করা এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমল।
হাদিস শরিফে বর্ণিত, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য প্রশস্তভাবে খরচ করবে, আল্লাহতায়ালা সারাবছর তার রিজিকে প্রশস্ততা দান করবেন’ (শুআবুল ইমান, বাইহাকি)। এর অর্থ অপচয় নয়, বরং সাধ্য অনুযায়ী পরিবারের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা।
কারবালার প্রান্তরে ৬১ হিজরির ১০ মহররম হজরত হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। এটি উম্মতের জন্য অবশ্যই বেদনাদায়ক। তবে ইসলামে মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালনের অনুমতি নেই (সহিহ বুখারি)। তাই আশুরাকে কেন্দ্র করে মাতম, বুক চাপড়ানো, শরীর রক্তাক্ত করা, তাজিয়া মিছিল বের করা শরিয়তসম্মত নয়।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র.) বলেন, ‘আশুরাকে শোকের দিন বা আনন্দের দিন বানানো উভয়ই বিদআত’ (মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৫/৩০৯)।
হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত আমাদের অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, সত্যের ওপর অবিচল থাকা এবং দ্বীনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের শিক্ষা দেয়। এই চেতনা লালন করতে হবে কর্মে ও চরিত্রে; আনুষ্ঠানিকতায় নয়। মহররম তাওবা, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাস। তাই আসুন, আমরা রোজা, দান-সদকা ও নেক আমলের মাধ্যমে মাসটির হক আদায় করি। কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত পথে চলে বিদআত ও কুসংস্কার বর্জন করি।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার