চারদিক
কুড়িগ্রামের এই চরের খবর কে নেবে?
জুয়েল রানা
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩তম জেলা কুড়িগ্রাম। দারিদ্র্য, অভাব-অনটনের বরাত দিয়ে এই জেলার নাম সবাই জানে। সেই কুড়িগ্রামের অনেকখানি চরাঞ্চল বা নদীভাঙন এলাকা। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা কোনোটিরই যেন মানোন্নয়ন হচ্ছে না। যত দিন যাচ্ছে, আরও বেশি নষ্ট হচ্ছে।
নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নে যেন সেই অনিয়ম আরও বেশি। স্কুল-মাদ্রাসার প্রাথমিক পর্ব অতিক্রম না করতেই মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে। ছেলেরা স্কুল ছাড়ছে। ৫০ জন পরীক্ষা দিলে ৫-১০ জন হাই স্কুলে ভর্তি হতে পারে। চরাঞ্চলে শিক্ষার মান প্রায় ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় চলে ভাড়াটে শিক্ষক দিয়ে। শিক্ষার্থীরা আসে মূলত রুটি, ডিম আর কলার লোভে। শিক্ষা কমকর্তারা চরাঞ্চলে যেতে চান না যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায়। নিয়মিত তদারকি না থাকায় কেউ কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
নারায়ণপুর ইউনিয়নে একটি মাত্র উচ্চ বিদ্যালয় ‘নারায়ণপুর দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়’, যার পরীক্ষায় পাসের হার দিন দিন কমছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েকজন শিক্ষক নাগেশ্বরী উপজেলায় বাসা করে থাকেন। মাঝে মাঝে তাদের বিদ্যালয়ে দেখা যায়।
ঝরে পড়া শিক্ষার্থী কেউ কেউ ঢাকা- চট্টগ্রাম যাচ্ছে কাজের খোঁজে। অনেকে মাদকদ্রব্য কেনাবেচায় জড়িয়ে পড়ছে।
সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় মাদকসহ চোরাচালান তাদের হাতের মুঠোয়। মাদকের সঙ্গে মোবাইল ফোন, ওষুধ, আসবাব, চিনি, লবণ, জিরা ইত্যাদি নিয়ে আসে সীমান্ত অতিক্রম করে। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় এসব আটকানোর জন্য কখনও পুলিশকে টহল দিতে দেখা যায় না।
স্থানীয়দের অনেক দিনের দাবি একটি অ্যাম্বুলেন্স, স্পিডবোট এবং নারায়ণপুরে প্রাথমিক ক্লিনিকের। এখানে একদিকে নদীর ওপর চর ভেসে ওঠে, তো অন্যদিকে ভাঙন শুরু হয়। ফলে অনেক বসতবাড়ি ভেঙে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পানি উন্নয়ন বোর্ড বা কোনো দপ্তর সেখানে গিয়ে খোঁজ নেয়নি– কী অবস্থায় আছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য নেই উন্নত নেটওয়ার্ক। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় একটি মাত্র নেটওয়ার্ক নারায়ণপুর পুরাতন বাজারের পাশে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু একটি মাত্র নেটওয়ার্ক পুরো ইউনিয়ন কভার করতে পারে না। আবার যতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকে ততক্ষণ নেটওয়ার্ক থাকে। বিদ্যুৎ চলে গেলে ৫-১০ মিনিট পর নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়। গত ঈদুল আজহার পর কালারচর বাজারের পাশে নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাজ শুরু হয়নি। বিদ্যুতের প্রধান সংযোগ কচাকাটা থানায় থাকায় এমনও হয়, দু-তিন দিন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে। পুরো ইউনিয়নে পাকা রাস্তা নেই। ইউপি চেয়ারম্যান কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। ছোট ছোট রাস্তা করে শেষ করছেন কাজ।
নির্বাচনকালে জনপ্রতিনিধি আসেন; একেকটি কথা দিয়ে যান; নির্বাচিত হওয়ার পর সব ভুলে যান। এ যাবৎ অনেক জনপ্রতিনিধি এসেছেন-গিয়েছেন; কেউ কাজের ধারা অব্যাহত রাখতে পারেননি। নারায়ণপুর ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ চায় তাদের এই ইউনিয়নকে আলাদাভাবে দেখে যেন সব দিকে উন্নয়নধারা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিক্ষার মান, উন্নত চিকিৎসা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নদীভাঙন রোধে যেন কার্যকর পদক্ষেপ নেয় সরকার।
জুয়েল রানা: শিক্ষার্থী, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ
- বিষয় :
- চারদিক