ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

নির্মম ইসরায়েলি কারাগার

নির্মম ইসরায়েলি কারাগার
×

নাসরিন মালিক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘এটাই শেষ দেখা। আমি আর বেঁচে ফিরে আসব বলে মনে হচ্ছে না। ওরা আমাকে মেরে ফেলার জন্যই এখানে নিয়ে এসেছে।’ চলতি মাসের শুরুর দিকে নিজের আইনজীবীকে এই কথাগুলো বলেছিলেন ড. হুসাম আবু সাফিয়া।

আবু সাফিয়া উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালক ছিলেন। ১৮ মাস আগে ইসরায়েলি বাহিনী তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। তার পর থেকে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই তাঁকে আটকে রাখা হয়েছে। হাতুড়ি আর লাঠি দিয়ে পেটানো, মারধর এবং অজ্ঞান করার মতো নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর সব শেষ যে ছবিগুলো সামনে এসেছে, তাতে তাঁকে গাজার অবরুদ্ধ স্বাস্থ্যকর্মীদের কণ্ঠস্বর হয়ে অসম্ভব পরিস্থিতিতেও দায়িত্ব পালন করে যাওয়া সেই আগের মানুষটির চেয়ে অনেক বেশি শীর্ণ ও জীর্ণ দেখাচ্ছে।

গত জুনে আবু সাফিয়াকে ‘রাকেফাত’ কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। এটি মূলত একটি ভূগর্ভস্থ বন্দিশালা, যা একসময় শীর্ষস্থানীয় সংগঠিত অপরাধীদের আটকে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। পরে এটি অমানবিক ও অনুপযুক্ত বিবেচনা করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ২০২৩ সালের শেষের দিকে অতি ডানপন্থি ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির বন্দিশালাটি আবার চালু করেন। আবু সাফিয়া এবং সেখানে থাকা অন্য ফিলিস্তিনি বন্দিরা কখনোই দিনের আলো দেখতে পান না, যা জেনেভা কনভেনশনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এবং ইসরায়েলজুড়ে তাঁর মতো প্রায় তিন হাজার ৫০০ বন্দিকে ‘প্রশাসনিক আটক’-এর অধীনে রাখা হয়েছে, যা ছয় মাস পরপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নবায়ন করা যায়। তাদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ২০০ শিশু।

এই নিয়মের অধীনে কোনো ফিলিস্তিনিকে আটক করার মানে হলো রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে কার্যত অপহরণ করা। আটকের পর যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা এক ‘প্রকৃত জাহান্নাম’।
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আলী আল-সামুদি চলতি বছরের শুরুতে যখন মুক্তি পান, তাঁকে চেনার উপায় ছিল না। তিনি তাঁর শরীরের ওজনের প্রায় অর্ধেক হারিয়েছিলেন, যা ছিল প্রায় ৬০ কেজি। সিএনএনকে তিনি বলেন, ‘আজকের দিনে কারাগার মানে শব্দটির প্রতিটি অর্থে একেকটি জাহান্নাম। আমাদের ওপর তারা যা কিছু করেছে, তার সবটাই ছিল কেবল শাস্তি আর প্রতিশোধ।’

ইতোমধ্যে ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে নির্যাতন, দুর্ব্যবহার এবং মৃত্যুর এই ভয়াবহ মাত্রা প্রমাণিত। মাঝেমধ্যে এমন কিছু ছবি সামনে আসে, যা এর ভেতরের পাশবিক আনন্দ ও বেপরোয়া নিষ্ঠুরতার দিক থেকে মার্কিনদের ‘আবু গারিব’ কারাগারের নির্মমতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই মাসের শুরুর দিকে এক ইসরায়েলি সৈন্যের তোলা একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা হয়। সেখানে দেখা যায়, গাজার এক ফিলিস্তিনি পুরুষকে অন্তর্বাস পরা অবস্থায় উপুড় করে একটি তক্তা ও লোহার রডের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। হিব্রু ভাষায় ছবিটির ক্যাপশন ছিল– ‘শুভ সকাল’।
আবু গারিবের সব ধরনের প্রতিধ্বনিই সেখানে স্পষ্ট ছিল। সেই অশুভ উল্লাস, বিবস্ত্র বন্দিদের ওপর যৌন নিপীড়নমূলক অপমান এবং ছবিগুলোকে এক ধরনের ট্রফি বা স্মারক হিসেবে ধরে রাখা।
বর্তমানে যা ঘটছে তা কোনো ব্যতিক্রম নয়, কোনো বিচ্যুতিও নয়। বরং এটিই এখন সাধারণ নিয়ম বা নীতিতে পরিণত, যা বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের দ্বারা এবং দৃশ্যত ইসরায়েলি সমাজের একাংশ দ্বারা স্পষ্টভাবে অনুমোদিত ও আশীর্বাদপুষ্ট। যতদিন এই সত্যটির মুখোমুখি হওয়া না যাচ্ছে, ততদিন ফিলিস্তিনিদের এভাবেই আটক করা হবে, নিখোঁজ করা হবে। নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন চালানো হবে। আর যারা এই অপরাধ করছে, তাদেরকেই মাঝে মাঝে অত্যন্ত বিনীত ও উদ্বিগ্নভাবে অনুরোধ করা হবে, ‘দয়া করে আপনারা নিজেরাই নিজেদের তদন্ত করুন।’

নাসরিন মালিক: দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক; দ্য গার্ডিয়ান
থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×