অন্যদৃষ্টি
বাগেরহাটের বিপন্ন স্বাস্থ্যসেবা
শেখ আবু তালেব
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’– চিরন্তন এই প্রবাদ আজ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্যোগপ্রবণ ও লবণাক্ততায় আক্রান্ত উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের প্রান্তিক মানুষের কাছে এক চরম পরিহাসে পরিণত। ভৌগোলিক দুর্গমতা, জলবায়ু পরিবর্তনের মরণকামড় এবং স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এখানকার লাখ লাখ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। জীবনযাত্রায় এর এতটাই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে যে, বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উপকূলীয় মানুষের গড় আয়ু দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে।
বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ এবং রামপালের মতো সরাসরি সমুদ্র-উপকূলবর্তী উপজেলাগুলোর স্বাস্থ্য সংকট এখন আকাশচুম্বী। বিশেষ করে মোংলা ও শরণখোলার মতো তীব্র লবণাক্ততায় আক্রান্ত অঞ্চলে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি।
দৈনন্দিন কাজে অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে জরায়ুতে প্রদাহ, জরায়ু ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপের কারণে অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের একলাম্পশিয়া (খিঁচুনি) এবং অকাল গর্ভপাতের মতো ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
উপকূলের মানুষের এই দুঃখকষ্টকে বহু গুণ করে দেয় প্রতিবছর আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হলে নোনাপানিতে মাসের পর মাস তলিয়ে থাকে পথঘাট। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় সড়কগুলো ভেঙে খানাখন্দে পরিণত হওয়ায় জেলা-উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে মুমূর্ষু
রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পথ অবরুদ্ধ হয়ে যায়।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকার কথা। বাগেরহাটের প্রত্যন্ত ইউনিয়নে এ নিয়ম কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। গ্রামীণ এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও চিকিৎসক সংকটে জর্জরিত। দুর্গমতা ও নাগরিক সুবিধার অভাবের অজুহাতে চিকিৎসকরা দ্রুতই বদলি হয়ে যান। নোনা বাতাসে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অনেক চিকিৎসাকেন্দ্রের ভবন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নষ্ট হচ্ছে রোগ নির্ণয়ের সাধারণ যন্ত্রপাতি। ফলে জীবন রক্ষাকারী
ওষুধের চরম সংকটের কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারে না।
চিকিৎসার আকাশচুম্বী ব্যয়ের কারণে প্রান্তিক মৎস্যজীবী, দিনমজুর বা লবণ চাষি পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে হাতুড়ে ডাক্তার বা ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ সেবন করে। ভুল ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়েটিক ব্যবহারের ফলে তারা পরে ক্রনিক কিডনি বা লিভারের মতো ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বর্ষাকালে নদীপথের ওপর নির্ভরশীল এ অঞ্চলে ঝড়বৃষ্টির দিনে যখন নৌকা চলাচল বন্ধ থাকে, তখন মাঝনদীতে বা প্রত্যন্ত চরে বিনা চিকিৎসায় অন্তঃসত্ত্বা ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র।
শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি বারবার ঘরবাড়ি হারানো ও তীব্র অর্থনৈতিক অনটনের ফলে উপকূলের মানুষের মধ্যে এক নীরব মানসিক রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।
এক পরিসংখ্যানমতে, উপকূলের ২২.৪৮ শতাংশ মানুষ মারাত্মক বিষণ্নতা এবং ৪৩.৯৫ শতাংশ মানুষ অনিদ্রায় ভুগছে। একটি জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক সংখ্যক মানুষ যদি অনিদ্রা ও মানসিক অবসাদে ভোগে, তবে সে অঞ্চলের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা থমকে যেতে বাধ্য।
বাগেরহাটের এই দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সংকট সমাধান করতে হলে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। সবার আগে গভীর নলকূপ স্থাপন, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং এবং লবণাক্ততা দূরীকরণ প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে সুপেয় পানি অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। লবণ পানির প্রভাব থেকে নারীদের বাঁচাতে নিরাপদ জীবন-জীবিকার সুযোগ এবং শিশুদের পুষ্টিহীনতা রোধে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ঝিমিয়ে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চালু করে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে হবে। উপকূলের প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার এবং মৌলিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অবিলম্বে পরিকল্পিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে– এটাই এ অঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষের প্রত্যাশা।
শেখ আবু তালেব: স্বেচ্ছাসেবক, ইনিশিয়েটিভ ফর রাইট ভিউ (আইআরভি)
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি