কূটনীতি
মার্কিন-চীন সম্পর্কের নতুন বিন্যাসে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বার্তা
প্রাজ্ঞ ঘিমিরে
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা, তাইওয়ান নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের বাণিজ্য ও প্রযুক্তিযুদ্ধের মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। আমরা কি এখন বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থার কৌশলগত পুনর্গঠন প্রত্যক্ষ করছি, নাকি এটি কেবলই আদান-প্রদানমূলক কূটনীতির আরেকটি ধাপ? আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই পরিবর্তনশীল সমীকরণ চীন-ভারত সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে এবং ফলস্বরূপ নেপালের জন্যই-বা এর অর্থ কী?
পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে উত্তেজনা কমিয়ে আনা এবং লেনদেনমূলক চুক্তি করার দিকে ঝুঁকছেন। বিনিময়ে এই নতুন সমন্বয় পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিরসনে চীনের সম্পৃক্ততাকে উৎসাহিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। কোনো কোনো বিশ্লেষক এই বিকাশমান সম্পর্ককে ‘শীতল শান্তি’ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা মূলত কতিপয় জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার জন্য একটি সীমিত ও ব্যবহারিক পুনঃযোগাযোগ।
একই সময়ে বেইজিং নিজেকে একটি শক্তিশালী অবস্থান থেকে বিশ্বমঞ্চের এক অপরিহার্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। নিজে অন্য দেশে রাষ্ট্রীয় সফরে না গিয়ে একের পর এক বিদেশি নেতাদের স্বাগত জানানোর মাধ্যমে চীন মূলত নিজের আত্মবিশ্বাসেরই জানান দিচ্ছে। এটি বেইজিংকে কূটনীতির একটি মূল কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে, যার মাধ্যমে তারা একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সামলাচ্ছে, অন্যদিকে বহুপক্ষীয় উপায়ে রাশিয়ার সঙ্গে একটি মজবুত কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখছে।
মজার বিষয় হলো, ওয়াশিংটন এবং বেইজিং গত ১৪ মের ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছে। চীন জোর দিচ্ছে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা, কৌশলগত স্থিতিশীলতা, তাইওয়ান প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান এবং মার্কিন ব্যবসার জন্য তাদের অর্থনৈতিক দুয়ার খোলা রাখার ধারাবাহিকতার ওপর। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্ব দিচ্ছে পারস্পরিক বাণিজ্য, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মার্কিন প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব রক্ষার ওপর।
বৃহৎ শক্তিগুলোর এই প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়াকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। এ অঞ্চলটি ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতা, ইউরেশীয় রাজনীতি এবং ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য পথগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এখানে একটি বিশেষ ত্রিমুখী সংকটের মুখোমুখি। এক, প্রতিরক্ষার জন্য এটি রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। দুই, আঞ্চলিক নেতৃত্বের জন্য চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। তিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক খোঁজা। যদি মার্কিন-চীন উত্তেজনা কমে যায়, তবে নয়াদিল্লি তার কৌশলগত সুবিধা হারানোর শঙ্কায় পড়বে। আবার বেইজিং ও মস্কোর সম্পর্ক যদি আরও গভীর হয়, তবে ভারতকে তার উত্তরের ভূরাজনৈতিক সীমান্তে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এর ফলে ভারত কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ বেছে নেওয়ার চেয়ে ‘বহু-মেরূকরণ’ নীতিতে আরও বেশি জোর দেবে।
দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর জন্য বিশ্বশক্তির এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কৌশলগত দরকষাকষি বা ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ বাড়ালেও নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হতে চাপও বৃদ্ধি করে। মার্কিন-চীন সম্পর্কের একটি কম সংঘাতপূর্ণ পর্যায় নেপালের রপ্তানি, পর্যটন এবং বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়িয়ে দিতে পারলেও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠোর রূপ নিলে অঞ্চলটিকে ‘ফ্রেন্ড-শোরিং’ বা মিত্র দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সীমাবদ্ধ করার দিকে ঠেলে দেওয়ার এবং নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে।
বিশেষ করে পরাশক্তিগুলোর যে সমস্ত উন্নয়ন প্রকল্পে নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের মতো লক্ষ্য যুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে নেপালের আরও কঠোরভাবে এই প্রশ্নগুলো করা উচিত। এই অর্থায়ন কি টেকসই? ঋণের শর্তগুলো কী কী? প্রকল্পের ওপর নেপালের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি-না? এবং এর থেকে নিশ্চিত অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যাবে কি-না?
বৃহৎ শক্তিগুলোর সম্পর্কের পুনর্গঠনের ফলে যে ভূরাজনৈতিক স্বস্তির জায়গা তৈরি হবে, কাঠমান্ডুর উচিত তাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে এগিয়ে নেওয়া। পরিশেষে, নেপালের সাফল্য নির্ভর করবে তারা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য ‘চীন কার্ড’ বা ‘ভারত কার্ড’ খেলা বন্ধ করে জাতীয় স্বার্থে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি বাস্তবসম্মত এবং বিষয়ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারছে কিনা।
প্রজ্ঞা ঘিমিরে: নেপালের ইনস্টিটিউট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্সের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য; দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- কূটনীতি