ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

কূটনীতিকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলে দেশেরই ক্ষতি

কূটনীতিকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলে দেশেরই ক্ষতি
×

কামরান রেজা চৌধুরী

কামরান রেজা চৌধুরী

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েক দিন আগে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগের খবর। জানানো হয়, জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী আইরিন খানকে এবং বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দীন নোমান চৌধুরী হচ্ছেন পররাষ্ট্র সচিব।

নতুন সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর পছন্দমতো কর্মকর্তাকে বদলি-পদায়ন করবে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু খবরটি প্রকাশিত হওয়ার দুই দিনের মধ্যেই সম্ভাব্য পররাষ্ট্র সচিবকে ‘আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগী’ আখ্যা দিয়ে বেসরকারি একটি টেলিভিশনে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। যদিও প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কূটনীতিকের কোনো বক্তব্য প্রচার করা হয়নি।
সম্ভাব্য পররাষ্ট্র সচিব ‘আওয়ামী লীগ সমর্থক’ কিনা, সেটির সাফাই গাওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে এ ধরনের কাজ কারা করেছে, কেন করা হয়েছে এবং এ ধরনের কাজের ফলাফল রাষ্ট্রের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর, সে ব্যাপারে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই।

হতে পারে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই কোনো কর্মকর্তা এ ধরনের প্রতিবেদন করতে উৎসাহ দিয়ে থাকতে পারেন। কারণ এ নিয়োগ বাতিল হলে অন্য কোনো কর্মকর্তার পথ খুলে যেতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরেও কারও কারও স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে। এর সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিরও কোনো কোনো পক্ষের হিসাব-নিকাশ থাকতে পারে। রাষ্ট্রীয় কোনো পদে সম্ভাব্য বা চূড়ান্ত নিয়োগের আগে-পরে এ ধরনের প্রতিবেদন বা আলোচনার সূত্র ধরে নিয়োগ বাতিলের নজির আমাদের দেশে কম নেই।

একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। ২০০৬ সালে আমি জার্মান সরকারের স্কলারশিপে বার্লিনে একটি আবাসিক কোর্সে অংশগ্রহণ করি। আমার ক্লাস যেখানে অনুষ্ঠিত হতো সেখান থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসের দূরত্ব ছিল দুই মিনিটের হাঁটা পথের। দুপুরের খাবার বিরতির সময় আমি দূতাবাসে গিয়ে সেখানকার কূটনীতিক এনায়েত হোসেনের সঙ্গে কথা বলে আসতাম। তিনিই মূলত দূতাবাস চালাতেন। 
কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি সেখানকার তৎকালীন রাষ্ট্রদূত এবং এনায়েত ভাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করার জন্য আমাকে প্ররোচিত করত। বলত, দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে কথা বলেন না; সেবা দেন না; দুর্ব্যবহার করেন ইত্যাদি। বিষয়টি নিয়ে আমি এনায়েত ভাইয়ের কাছে জানতে চাই– কেন তারা দেশের মানুষকে সেবা দেন না। জবাবে এনায়েত ভাই যা বললেন সেটি আমার চোখ খুলে দেয়। 
জার্মান সরকারের একটি চিঠি দেখিয়ে তিনি বললেন, সেই ছেলে কুমিল্লায় ছাত্র রাজনীতি করত। সেখানে একটি খুনের আসামি। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার পর পালিয়ে জার্মানি এসে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইছে। এখন দূতাবাস থেকে বলে দিলে সে এখানে থাকতে পারবে এবং একদিন হয়তো নাগরিক হবে। এ জন্য রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়।

যাই হোক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়াদি কভার করতে গিয়ে সেখানকার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ও যোগাযোগ রয়েছে। সেখানে বর্তমানে খুব ভালোমানের কূটনীতিক আছেন, যাদের অনেকেই পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার যোগ্যতা রাখেন এবং হতে চান। পররাষ্ট্র সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার পদ বেশ কয়েকটি থাকলেও পররাষ্ট্র সচিব পদ একটিই। সে কারণেই এই পদে বসার জন্য এত প্রত্যাশী। কিন্তু এর আগে পররাষ্ট্র সচিব নিয়োগের এমন তীব্র নেতিবাচক প্রচারণা দেখা যায়নি।

এই নেতিবাচক প্রচারণার জন্য যদি নতুন পররাষ্ট্র সচিবের নিয়োগ বাতিল হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যতে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের আগে এমন নেতিবাচক প্রচারণার নতুন সংস্কৃতি চালু হবে, যার ফলাফল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
বাংলাদেশের মতো সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য কূটনীতি হলো জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রথম স্তর। সেই কূটনীতিকরা যদি বিতর্কিত হয়ে যান; তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে তাহলে তারা দেশের জন্য কতটুকু অবদান রাখতে পারবেন?

সামাজিক মাধ্যমের যুগে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এবং একজন জ্যেষ্ঠ পেশাদার কূটনীতিকের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি হওয়ার মতো উচ্চমানের কূটনীতিক তৈরি করতে গরিব এই রাষ্ট্রের কত অর্থ, কত সম্পদ বিনিয়োগ করতে হয়েছে।
তিনি যদি কোনো খারাপ কাজ করেন, দুর্নীতি করেন, আইন লঙ্ঘন করেন তবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সরকারের। তবে কোনো কূটনীতিকের চরিত্র হনন গ্রহণযোগ্য নয়।
মনে রাখতে হবে, একজন কূটনীতিকের মূল সম্পদ হচ্ছে অন্য পক্ষে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, যা দিয়ে তিনি দেশের পক্ষে দরকষাকষি করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেন। তাঁর গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাঁর অবস্থানকে খাটো করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা কূটনৈতিক যোগ্যতাকে খাটো করে লাভ কার? অনেক সময় আমরা সরাসরি বুঝতেও পারব না এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারণার পরিণতি। কিন্তু হয়ে যাবে দেশের ইমেজ ও স্বার্থের অপূরণীয় ক্ষতি।

এভাবে প্রতিটি উচ্চ পদে নিয়োগের আগে যদি তাদের বিরুদ্ধে এভাবে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয় তাহলে প্রতিষ্ঠান হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। এই বিষয়টি যারা এমন নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছেন তাদের স্মরণ রাখা উচিত। তারা কলকারখানার শ্রমিকদের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। কলকারখানার প্রকৃত শ্রমিকরা আন্দোলন করলে কখনও কলকারখানা ভাঙচুর করেন না; ভাঙচুর করে বহিরাগতরা। তারা এটুকু মনে রাখেন– এই কলকারখানাই তাদের রুটি-রুজির প্রধান উপজীব্য। 
একইভাবে কূটনীতিকদের মনে রাখতে হবে, বিদেশে পোস্টিং করার কারণে সরকারি অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা তাদের ঈর্ষা করেন। প্রতিষ্ঠান হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কলঙ্কিত হলে তারাও কলঙ্কিত হবেন। বাংলা প্রবাদ– ‘ওপর দিকে থুতু দিলে নিজের গায়ে পড়ে।’ আরও মনে রাখতে হবে, তাদের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাহাজ ডুবে গেলে সবাই মরবেন, দেশ ডুববে। 

কামরান রেজা চৌধুরী: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×