ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

স্মরণ

মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর

মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর
×

ফকির আলমগীর (১৯৫০-২০২১)

সুরাইয়া আলমগীর

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীরের ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। এই প্রথিতযশা শিল্পী সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। ছোটবেলা থেকেই দুর্গম, কণ্টকময় পথ চিনেছিলেন। হয়তো তখনই পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁকে দুস্তর পথ পাড়ি দিতেই হবে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে।

ফরিদপুরের কালা মৃধা গোবিন্দ হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে মায়ের মমতামাখা আঁচল ছেড়ে গাঁয়ের হালট ছেড়ে চলে আসেন ইট-পাথরের নগরী ঢাকা শহরে। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজে। পল্টনের বাঁশি বিক্রেতা হ্যাজাক বাতির আলোয় বাঁশির মনোমুগ্ধকর সুর তাঁকে আকৃষ্ট করে। গ্রামের ছেলে ফকির আলমগীর তুলে নেন হাতে বাঁশের বাঁশরি। পরিবেশ পরিস্থিতি তাঁকে শিল্পী হওয়ার মন্ত্রণা জুগিয়েছে।

চিরতরুণ, চিরসবুজ এই শিল্পীকে ক্লান্তি কখনও পরাভূত করতে দেখিনি। ৪৪ বছর তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছি, যা জীবনের দীর্ঘ সময়। দেখেছি সত্যবাদী; শুদ্ধতা, সততার এক অনন্য মানুষের স্বরূপ। সাজানো-গোছানো ড্রয়িংরুম থেকে গান কণ্ঠে তুলে নেমেছেন রাজপথে। ফকির আলমগীর জাতশিল্পী– দ্রোহে নজরুল, দেশাত্মবোধে জীবনানন্দ দাশ, প্রেমে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় চে গুয়েভারা। পল্লিনির্ভর বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলে সে সংস্কৃতির শরীরে ও মর্মে লেগে আছে লোকায়ত মানুষের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ, আনন্দ- বেদনা, স্বপ্ন-সংগ্রামের আবেগ। লোকজীবনকেন্দ্রিক বাঙালি সংস্কৃতি হাজার বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষকে ঋদ্ধ করেছে। তাদের দেখিয়েছে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। কর্ষণ যেমন পতিত জমিকে করে তোলে ফসলের জন্য উর্বর, তেমনি সংস্কৃতি মানুষকে করে তোলে উন্নত রুচি ও উৎকৃষ্টময় চিত্তের অধিকারী। তেমনি ফকির আলমগীর লোকায়ত লোকগানকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে ধারণ করা শত শত সখিনা, শবমেহেরের দুঃখভরা বেদনার জীবনের আর্তি মানুষের মনে এক বেদনার আবহ সৃষ্টি করেছে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলতার সঙ্গে সাংবাদিকতা বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। গেয়েছেন গণসংগীত; চাকরি করেছেন গণসংযোগ বিভাগে; বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনে।
গণমানুষের শিল্পী ফকির আলমগীর সাধারণ মানুষের মধ্যে অমর হয়ে থাকবেন তাঁর সৃজনশীলতার মাঝে। তিনি খুব পরিশ্রমী শিল্পী ছিলেন। শত প্রতিকূলতায়ও তাঁকে দমে থাকতে দেখিনি। কাজপাগল মানুষ; পাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা ফকির আলমগীর জিরো থেকে হিরো হয়েছিলেন। সেটা সম্ভব হয়েছে তাঁর আত্মবিশ্বাস, নিষ্ঠা, মেধা আর একাগ্রতার জন্য।
১৯৭৬ সালে অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন প্রগতিশীল গণসংগীতের দল ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী। বাংলাদেশের সব গণসংগীতের দল নিয়ে গঠন করেছেন গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলা একাডেমির ফেলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য, পল্লীমা সংসদের আজীবন সদস্য একজন লেখক হিসেবেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি ২৫টি বই লিখেছেন। অনেক অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি রয়ে গেছে তাঁর। ২০১৯-এ পবিত্র হজ পালন করেছেন। হজব্রত উপলক্ষে গবেষণাধর্মী বই ‘ইহরাম থেকে আরাফাত’ মৃত্যুর ১০ দিন আগে অনন্যা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।

২০২১ সালের ২৩ জুলাই সব স্বজন, পরিবার-পরিজন, ভক্ত-শ্রোতাকে কাঁদিয়ে, অনেক কাজ অসম্পূর্ণ রেখে, বলতে গেলে হঠাৎ চলে যান না ফেরার দেশে। তখন করোনা মহামারি ভয়াবহ আকারে বিস্তার লাভ করেছিল সারাদেশে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ছিল মহামারি আকারে। আতঙ্কিত মানুষ। সারাদেশে চলছে লকডাউন। বন্দিজীবন। সেই পরিস্থিতিতেই ফকির আলমগীর লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছিলেন পুরো দমে। ভার্চুয়ালি যুক্ত হচ্ছেন বিভিন্ন লাইভ প্রোগ্রামে। তারপর হঠাৎ তিনিও করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলে যান পৃথিবী ছেড়ে।
প্রিয় শিল্পী, প্রিয় মানুষ ফকির আলমগীরের মৃত্যুবার্ষিকীতে আজ তাঁকে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। 

সুরাইয়া আলমগীর: ফকির আলমগীরের সহধর্মিণী; সভাপতি, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী

আরও পড়ুন

×