আন্তর্জাতিক
ট্রাম্প যেভাবে আরেকটি ‘ভিয়েতনাম’ এড়াতে পারেন
ডেভিড হার্স্ট
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ধীরগতির কোনো গাড়ি দুর্ঘটনার মতোই ইরানকে নিশানা বানিয়ে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাগুলো তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের দিকে গড়াচ্ছে। একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সার্বভৌমত্ব স্পষ্ট স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং ইসরায়েলও লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু সেই চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুটি প্রতিশ্রুতি থেকেই সরে এসেছেন এবং একটি পূর্ণ মাত্রার ও ক্রমবর্ধমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আবার ফিরে গেছেন।
ট্রাম্প এবং তাঁকে এই যুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার পেছনে যাঁর মূল ভূমিকা রয়েছে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। উভয়েই এই অস্ত্রবিরতি চুক্তির জন্য নিজ দেশে কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। ট্রাম্পের ওপর ক্ষোভের কারণ তিনি এতে স্বাক্ষর করেছিলেন, আর নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে তা ছিল তাঁর এই আলোচনার প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়া এবং ইসরায়েলের মূল মিত্র ও অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র অসময়ে শান্তি চাপিয়ে দিয়েছে– এমন অনুভূতি তৈরি হওয়া।
উভয় নেতার কেউই এই চুক্তিকে যৌক্তিক বলে প্রমাণ করতে পারেননি, যা তাদের দেশে একটি বড় পরাজয় বা আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। সামনে দুজনেরই নির্বাচন। তাই তেহরানের বিরুদ্ধে এই শক্তির মহড়াকে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। তারা দুজনেই নিজেদের তৈরি এক অমোঘ ফাঁদে আটকে গেছেন। ইরানকে ‘গুঁড়িয়ে দেওয়া, মুছে ফেলা ও ধূলিসাৎ করে দেওয়া’র মতো তাদের অসংখ্য দাবি যখনই মিথ্যা প্রমাণিত হলো, তখনই সব প্রক্রিয়া নতুন করে আবার শুরু করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ ছিল না।
গাজায় হামাস এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রেও বারবার একই ঘটনা ঘটেছে। নিজেদের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক হত্যার পর আন্দোলনগুলো যে টিকে থাকতে পারে– এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার একমাত্র উপায় ছিল আবার যুদ্ধে ফিরে যাওয়া। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত চুক্তিকে ইরান কখনও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি সঞ্চয় ও পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত হওয়ার একটি সুযোগ ছাড়া অন্য কিছু মনে করেনি। ইরান পরিষ্কার জানিয়েছিল– তাদের ওপর আবার হামলা হলে এ অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন সেনাদের খেসারত দিতে হবে। বাস্তবে তা-ই ঘটেছে। গত দুই সপ্তাহে প্রায় ১০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছে। অন্যদিকে ইরাক ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় চারজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে এবং জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রায় ২০টি ঘাঁটিতে মোতায়েন থাকা ৫০ হাজার সেনাকে সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা যে পেন্টাগনের নেই– তা এখন পরিষ্কার।
তবে আপাতত পরিস্থিতির দিকনির্দেশনা স্পষ্ট এবং তা ইসরায়েলের বিপক্ষে যাচ্ছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু প্রথমবার ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে কেবল জনমতই বদলায়নি; বদলেছে ইরানও। এটা এখন একদম পরিষ্কার– ইসলামিক রিপাবলিকের ওপর বিক্ষুব্ধ সাধারণ ইরানিদের ওপর এই হামলা সম্পূর্ণ বিপরীত প্রভাব ফেলেছে।
এটি ইরানি জাতীয় পতাকার তলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছে; এমনকি তাদেরও যারা গত জানুয়ারির গণবিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন এবং যা অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল। সেই অভ্যন্তরীণ বিভাজন মুছে যায়নি সত্য, তবে জাতীয় সংকটের এই সময়ে তা আপাতত স্থগিত হয়েছে।
যেমনটি বিশিষ্ট ইরানি-মার্কিন শিক্ষাবিদ ও সাবেক কূটনীতিক ভালি নাসর আমাকে বলছেন, ‘সবকিছু আসলে এই প্রণালি ঘিরে; কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা সমঝোতা স্মারকের কয়েকটি লাইনের বিষয় এটি নয়... যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের সময়টিকে একটু জিরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের সামলে নেওয়ার জন্য এবং লেবানন ও প্রণালিতে ইরানের প্রভাব দুর্বল করতে ব্যবহার করতে চায়। একই সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে যা দেওয়ার কথা ছিল, তা সত্যিই দিতে চায় না।’
নাসরের মতে, এটি শুরু থেকেই ট্রাম্পের নেওয়া কৌশলের সঙ্গেই মিলে যায়– ‘আমি আসলে কোনো আলোচনা করতে চাই না। আমি শুধু নিজের শর্ত চাপিয়ে দিতে চাই।’ ভিয়েতনামে জয় পাওয়া সম্ভব নয়– মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সত্যটি অনুধাবন করার পরও সেখান থেকে সেনা গুটিয়ে নিতে দীর্ঘ সাত বছর সময় নিয়েছিল। আশা করি, ট্রাম্পের এটি বুঝতে ততটা সময় লাগবে না– ইরান বা সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর পক্ষে জেতা সম্ভব নয়।
ডেভিড হার্স্ট: মিডল ইস্ট আইর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক; মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক