প্রতিবেশী
তেলাপোকা গণতন্ত্র: নিরস্ত্র তবে বিপজ্জনক
অরুন্ধতী রায়
অরুন্ধতী রায়
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বহু বছর পর এই প্রথম ভারতীয় হিসেবে আমার ভালো লাগছে। ঠিক যখন সব আশা শেষ হয়ে যাচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল, তখনই ওরা এলো। বৃষ্টিভেজা দিনে বেরিয়ে এলো এক দল তরুণ তেলাপোকা। এক বিচারক আর এক কৌতুকের অপবিত্র মিলনের ফসল এই প্রজন্ম।
গল্পটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তুলে রাখার খাতিরে আরও একবার বলা যাক। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এক চরম অহংকারী ও অবমাননাকর মন্তব্যে কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ বলে খোঁচা দিয়েছিলেন। তার জবাবে বোস্টনে থাকা অভিজিৎ দীপকে নামে এক ছাত্র ইনস্টাগ্রামে লেখেন– ‘যদি সব তেলাপোকা এক হয়ে যায়, তবে কী হবে?’ কোটি কোটি তরুণ এতে সাড়া দেয়। এভাবেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
অভিজিৎ দীপকে হয়ে উঠলেন এই তেলাপোকাদের বাঁশিওয়ালা। তাদের প্রথম দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, যিনি একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও পচে যাওয়া মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্বিকার বসে আছেন, যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়মিত সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। বিরোধী দলগুলোর মতে, ২০১৪ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৫২টি প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাগুলো লাখ লাখ তরুণের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে, যারা বছরের পর বছর এসব পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানকে পড়াতে এবং পরীক্ষার ফি দিতে গিয়ে নিজেদের জমিজমা বা ঘরবাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। একটি নিপীড়নমূলক আইনি বন্দোবস্ত। সম্প্রতি ‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর হতাশায় ভেঙে পড়ে ১২ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।
এই তরুণদের শক্তি কি আমাদের এই গর্ত থেকে তুলে আনতে পারবে? সহজ নয়। ভারতে অতীত গণআন্দোলনগুলোর ইতিহাস হতাশার। ষাট ও সত্তরের দশকে নকশালদের সশস্ত্র আন্দোলনসহ নানা আন্দোলন জমির পুনর্বণ্টন ও কৃষকদের অধিকারের দাবি জানিয়েছিল; তাদের পিষে দেওয়া হয়েছিল। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’ বা ছত্তিশগড়-ঝাড়খণ্ডের আন্দোলন ভূমিহীন ও আদিবাসীদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। তাদের দাবি ছিল– অন্তত যা আছে তা যেন কেড়ে নেওয়া না হয়। তাদেরও দমন করা হয়েছে। ২০০০ সালের পর মানুষ কেবল ১০০ দিনের কাজের দাবির (এনআরইজিএ) মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল, যা দিয়ে বড় জোর কোনো অভিজাত রেস্তোরাঁর এক বেলার খাবার হয়। বর্তমান শাসক দল সেটাও বন্ধ করে দিয়ে মোদিজির ছবি দেওয়া চাল-ডালের বস্তা ছুড়ে দিচ্ছে, যেন ভিক্ষুককে দান করা।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের লড়তে হচ্ছে কেবল নাগরিকত্ব আর ভোটের অধিকার বহাল রাখার জন্য। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং এনআরসি হলো নাৎসি জার্মানির ১৯৩৫ সালের ‘ন্যুরেমবার্গ আইন’-এর ভারতীয় সংস্করণ, যেখানে নাগরিকদের নিজেদের বংশপরিচয়ের কাগজপত্র দেখাতে হতো। ভারতের কতজনের কাছে সেই কাগজপত্র আছে? সিএএ-বিরোধী আন্দোলন দমন করা হলেও সরকার তখন কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এখন তা নতুনরূপে এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন হিসেবে ফিরে এসেছে। আমাদের বলা হচ্ছে, এমনকি পাসপোর্টও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়! লাখ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। তথাকথিত ‘সন্দেহজনক নাগরিকদের’ জন্য তৈরি ডিটেনশন ক্যাম্পে কারা যাবে? কার ঠাঁই হবে সেখানে? ফ্যাসিবাদের মূল অস্ত্রই হলো সংশয় ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করা।
আমাদের ভয় ও উদ্বেগ থেকে আমরা হয়তো এই তেলাপোকাদের আন্দোলনের ওপর খুব বেশি আশা চাপিয়ে দিচ্ছি। কেউ কেউ এটাকে বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার তরুণদের আন্দোলন থেকে সরকার পতনের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন। আবার কেউ ১৯৭৭ সালের জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করছেন। কিন্তু ভারত বিশাল এক দেশ। এসব তুলনা এখানে খাটে না। ককরোচ জনতা পার্টি সম্পূর্ণ আলাদা এক আন্দোলন; নিজের সময়ের এক অনন্য সৃষ্টি। এটি অসহায় তরুণদের সঙ্গে এক নির্মম ও প্রতিশোধপরায়ণ সরকারের লড়াই, যে সরকার তার বিরোধীদের বিন্দুমাত্র ক্ষমা করে না। প্রতিশোধ যে নেওয়া হবে– তা নিশ্চিত।
যে সরকার মানুষের কাছে এত অপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তারা কীভাবে কোনো নতি স্বীকার না করে এত আত্মবিশ্বাসী থাকে? কারণ, তারা পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিজেদের কবজায় নিয়েছে। নির্বাচন কমিশন আর নিরপেক্ষ নয়। ইভিএম কারচুপি, লাখ লাখ ভুয়া ভোটার যুক্ত করা, মেরুদণ্ডহীন আমলাতন্ত্র, বিকিয়ে যাওয়া আদালত আর সংবাদমাধ্যম– সবই সরকারের আজ্ঞাবহ। নির্বাচনী সীমানার পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে, যাতে সব সময় বিজেপিরই জয় হয়। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী রাজনৈতিক দল এটি, যার পেছনে ধনকুবেরদের হাত রয়েছে। তারা মনে করে, সবকিছু কেনা সম্ভব।
কিন্তু এই খেলা কি চিরকাল চলবে? ১৫০ কোটি মানুষের একটা দেশকে কি চিরকাল লাশের মতো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? কখনোই না। তেলাপোকারা রাস্তায় নেমে পড়েছে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে কৃষকরা আবার দিল্লির দিকে যাত্রা শুরু করেছেন, যা তাদের মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করার শামিল। শহরের সীমানা সিল করে দেওয়া হয়েছে; কিন্তু কৃষকদের রোখা সহজ নয়। হয়তো আমাদেরও এই কৃষক আর তরুণ তেলাপোকাদের কাছ থেকে শিখতে হবে– কীভাবে একটু ‘বিপজ্জনক’ হয়ে উঠতে হয়। এই তরুণরা আমাদের একটা বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। তাদের এই বলিদানকে সার্থক করে তোলার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।
একজন প্রধানমন্ত্রী যখন রাস্তায় প্রতিবাদ দেখে শারীরিকভাবে পালিয়ে যান, তখন রাজনীতি থেকেও তাঁর পালিয়ে যাওয়ার সময় বেশি দূরে নয়। তবে এই শাসক দল সহজে ছাড়বে না। রাজধানীর রাজপথে এমন অপমান তারা সহ্য করবে না। সামনে হয়তো রক্তপাত অপেক্ষা করছে। তরুণদের ধৈর্য ভেঙে যাচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে উত্তেজিত ভিড় থেকে কোনো ভুল হলে পুলিশ গুলি চালানোর অজুহাত পেয়ে যাবে। তারা আমাদের ভাঙার চেষ্টা করবে, আর আমাদের কাজ হবে তাদের থামানো।
অরুন্ধতী রায়: লেখক; দ্য ওয়ার থেকে
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- অরুন্ধতী রায়