সমকালীন প্রসঙ্গ
বিশ্ববিবেকের দশাটা এমন কেন
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪০ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট হন তখনই আশঙ্কা করা গিয়েছিল যে এবার তিনি ‘বড়’ একটা কিছু না করে ছাড়বেন না। কারণ একে তো তিনি ঝানু ব্যবসায়ী, তদুপরি এবার তাঁর আওয়াজটাই ছিল ‘আমেরিকা শ্যাল বি গ্রেট অ্যাগেইন’। আর গ্রেট হতে গেলে তো তাবৎ প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছোট করাটা একেবারেই বাধ্যতামূলক। শঙ্কা মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। শুরু করেছিলেন চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ দিয়ে, সুবিধা হয়নি। তবে তাতে দমেননি, হামলে পড়েছেন ইরানের ওপর। এখানেও অবশ্য সুবিধা হয়নি। তবে ছোটখাটো এবং নিরীহ প্রতিবেশী কিউবা আছে, তাকে বিধ্বস্ত করে নিজেদের গ্রেটনেস প্রদর্শন করবেন। আশা করি সেখানেও ব্যর্থ হবেন।
তা আমেরিকানরা তাঁকে কেন ভোট দিল? তার একটা কারণ নিশ্চয়ই গ্রেটনেস-প্রাপ্তির ওই উচ্চাভিলাষ। পুঁজি ছাড়া ‘উন্নতি’ অসম্ভব, আবার উন্নতির প্রয়োজনে সবকিছু চুরমার করে দিতেও পুঁজির বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। মানবিক সম্পর্কের আবশ্যকতার সে ধার ধারে না। এবং শেষ পর্যন্ত তার কাজটা দাঁড়ায় ধ্বংসেরই– যদি তার মালিকানাটা হয় ব্যক্তিগত। পুঁজির মোহে পড়ে গরিবও ভাবে সেও ধনী হবে। একজন মানুষের কতটা জমি প্রয়োজন, এমন প্রশ্ন নিয়ে টলস্টয়ের একটি ছোট গল্পে আছে; জবাব হলো শেষ পর্যন্ত দৈর্ঘ্যে ছয় ও প্রস্থে তিন ফুট হলেই চলে, কবর দেওয়ার জন্য। অর্জিত জমি সে যে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না এটা কি সে জানে না? জানে; তবুও থামে না। কারণ ধন-বৃদ্ধির চেষ্টা একটা নেশা এবং নেশা যদি কাউকে কাবু করতে পারে তবে এমন কিছু থাকে না নেশাগ্রস্তকে যে থামাবে। পুঁজি মানুষকে দুর্দমনীয় রূপে নেশাগ্রস্ত করার ক্ষমতা রাখে।
নেশার একটা বড় শক্তি রয়েছে আকর্ষণের ক্ষমতার ভেতরে। ট্রাম্পকে যেসব আমেরিকান রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছে তারাও বড়লোক হওয়ার নেশায় আসক্ত। তারা ভেবেছে ট্রাম্পের দলে থাকলে ছিটেফোঁটা তাদের ভাগ্যেও জুটে যাবে।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘তাসের দেশ’ নাটকে এক রাজপুত্র এবং এক সওদাগরপুত্রের কথা লিখেছেন; সেখানে দেখা যাচ্ছে বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে সওদাগরপুত্রের তুলনায় রাজপুত্রের আগ্রহই অধিক। এটা কিন্তু সাধারণ নিয়মের ভেতর পড়ে না। আগ্রহ সওদাগরপুত্রেরই উপচে পড়ার কথা, রাজপুত্র তাতে শেষ পর্যন্ত সাড়া দেবে, এমনটাই ঘটা স্বাভাবিক। এবং সেটাই ঘটে চলেছে, সওদাগরপুত্ররা কেবল যে রাজপুত্রদের বাণিজ্যে যেতে অনুপ্রাণিত করছে তা-ই নয়, তারা নিজেরাই রাজপুত্র বনে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে সেটাই ঘটনা।

আর গণতন্ত্রের আদর্শ লালনভূমি হওয়ার দাবিদার যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যাচ্ছে আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো দরিদ্র ঘরের সন্তান যে প্রেসিডেন্ট হবেন, একালে সে-স্বপ্ন আকাশকুসুম। প্রেসিডেন্ট হওয়া অনেক দূরের কথা, প্রার্থীও হতে পারবেন না। প্রার্থী হওয়ার জন্য নিজে ধনবান হলে ভালো, না হলে ধনবানদের সমর্থন চাই। ট্রাম্পের মতো লোকদেরই সেখানে সুবিধা। আর প্রেসিডেন্ট হতে হলে লিঙ্কনের মতো শক্ত নৈতিক মেরুদণ্ডের মানুষ হতে হবে এই রীতিও এখন আর বহাল নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প তো বিভিন্ন অপরাধের জন্য বিখ্যাত, তবুও তিনি কেবল মনোনয়নই পান না, দুই-দুইবার নির্বাচিত হয়ে আসেন। ওদিকে ইসরায়েলের জায়নবাদী যুদ্ধবাজ যে নেতা, নেতানিয়াহু নাম, সে ব্যক্তি তো একজন চিহ্নিত অপরাধীই, দুর্নীতির দায়ে আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলছিল, মামলা কাঁধে নিয়েই তিনি নির্বাচিত হয়েছেন এবং ফিলিস্তিনিদের উৎখাত শুধু নয়, প্রতিদিন হত্যা করছেন এবং শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহায়তায় ইরানের ওপর আগ্রাসন চালিয়েছেন, যে ঘটনায় এক হামলাতেই স্কুলে-পাঠগ্রহণরত ১৬৫ জন কন্যাশিশু প্রাণ হারিয়েছে। বিশ্ববিবেক নড়েচড়ে ওঠেনি, প্রতিবাদ যা হয়েছে তাও তেমন প্রচার পায়নি। পুঁজিবাদীদের নৃশংসতার এটি দৃষ্টান্ত এবং বিশ্ববিবেকের পক্ষে তা সহ্য করার এটি একটি প্রমাণ বটে। নৃশংসতার কোনো শেষ নেই। কয়েকদিন আগের এক তথ্যে দেখেছি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, মার্কিন-ইরান তথাকথিত যুদ্ধে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে তা দিয়ে আট কোটি মানুষের প্রাণ রক্ষা করা যেত। জাতিসংঘ অপরাধীদের কী বিচার করবে, হত্যাকাণ্ড থেকে তাদের নিবৃত্ত করতেও পারছে না। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের যেভাবে হত্যা ও বিতাড়ন করা হয়েছে সে ঘটনাও কি শিউরে ওঠার মতো নয়? অথচ পুঁজিবাদী বিশ্ব এ নিয়ে টুঁ শব্দটি করেনি, করছে না। গণহত্যাকে তারা বলে মানবিক বিপর্যয়, যেন বৈরী প্রকৃতি ঘটনাটি ঘটিয়েছে, নৃশংস মানুষেরা নয়। পুঁজিবাদী বিশ্ব মিয়ানমারের সম্পদের লোভে কাতর থাকে, মানুষের দুর্দশা ও হত্যা দেখার সময় পায় না।
যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে ব্যয়ের রেকর্ড ক্রমাগত সম্প্রসারিত করছে। বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র-উন্নয়নে ব্যয় গত বছর রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে বলে জানিয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্তর্জাতিক জোট। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র প্রস্তুতের ক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মরিয়া হয়ে উঠেছে; তাই বলে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র-উৎপাদনে কারও যে কোনো আপত্তি আছে তা নয় এবং ইসরায়েল ওই অস্ত্র উৎপাদন করে কি করে না সে প্রশ্নে ইসরায়েল নিশ্চুপ, যুক্তরাষ্ট্রও সেটা জানার জন্য বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায় না। বিশ্ববিবেকের দশাটা এমনই বিবেকহীন।
পুঁজির প্রেমিকদের ভেতর প্রতিযোগিতা আছে, ঝগড়া-ফ্যাসাদ যে বাধে না তাও নয়, তবে তারা এক হয়ে যায় এক ব্যাপারে, সেটি হলো দরিদ্রকে শোষণ করে ধনী হওয়া। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইলন মাস্কের ঝগড়ার খবর আমরা শুনেছিলাম, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর পার্থক্যের খবর বিশ্ববাসীর অজানা নয়। যেমন, ট্রাম্পের আওয়াজ হলো আমেরিকাকে ফের ‘বড়’ করা, অর্থাৎ আমেরিকা আগে বড় ছিল, এখন নেই, তাই তাকে আবার বড় করে তোলা চাই। ইলন মাস্ক আমেরিকা নিয়ে ভাবেন না, তিনি বিশ্বপ্রেমিক এবং তাঁর বিবেচনার জগতে অতীত নেই, রয়েছে ভবিষ্যৎ, প্রযুক্তির ব্যবসা করে মানুষের ভবিষ্যৎকে তিনি আরও উন্নত করবেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতে তাঁর সবিশেষ আগ্রহ। দুজনেই ব্যবসায়ী, তবে ট্রাম্প রাজনীতিতেও আগ্রহী; মাস্ক সার্বক্ষণিক ব্যবসায়ী। তবে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে মাস্কের আর্থিক সাহায্য ট্রাম্পের কাজে লেগেছে এবং ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার দরুন মাস্কের সুবিধা হয়েছে, বিশ্বের সেরা ওই ধনী আরও ধনী হয়েছেন। ঝগড়া-বিবাদ তো ভাইয়ে ভাইয়েও হয়, কিন্তু তাই বলে ভ্রাতৃত্ব কী ঘুঁচে যায়?
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়