ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

খাদ্য নিরাপত্তা

বিলম্বে ঝুঁকিই বাড়িবে

বিলম্বে ঝুঁকিই বাড়িবে
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হইবার পরিণামে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি ৮১ লক্ষ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়িতে পারে বলিয়া জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে যেই সতর্কবাণী উচ্চারিত হইয়াছে তাহা প্রণিধানযোগ্য। আমরা জানি, দেশের কৃষি বহুলাংশে আমদানিনির্ভর সার ও জ্বালানির উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করিয়া ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের একটি বড় অংশ ঐ যুদ্ধপীড়িত অঞ্চল হইতে আমদানি করিতে হয়। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে উহার মূল্য ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে, অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে তিনটির উৎপাদন বন্ধ রহিয়াছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হইলে কেবল সারের দাম কৃষকের নাগালের বাহিরে যাইবে না, সার সরবরাহও বন্ধ হইয়া যাইতে পারে। অতএব জাতিসংঘের উক্ত সতর্কবার্তার জরুরি ভিত্তিতে আমলে লইবার কোনো বিকল্প নাই। উল্লেখ্য, শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মজুত ইউরিয়া দিয়া আগামী অক্টোবর পর্যন্ত চলিতে পারে। অর্থাৎ আগামী আমন ও বোরো মৌসুম লইয়া উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রহিয়াছে।

এদিকে গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ শীর্ষক জাতিসংঘের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, ২০২৩-২৫ সময়ে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৬ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় চার কোটি ৫৪ লক্ষ মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে ছিল। অর্থাৎ যুদ্ধের পূর্ব হইতেই দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত ও পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করিতে পারিতেছে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে দেশের এক কোটি ৪৩ লক্ষ মানুষ অপুষ্টিজনিত ক্ষুধায় ভুগিতেছে। উপরন্তু, প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ তথা প্রায় ছয় কোটি ৭৮ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নাই। যে সুষম খাবারে একজন মানুষের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় দুই সহস্র ৩৩০ কিলোক্যালরি শক্তি নিশ্চিত হয়, জাতিসংঘ উহাকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা (হেলদি ডায়েট বাস্কেট) বলে। সর্বোপরি, বাংলাদেশে একজন মানুষের প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর খাদ্যের গড় ব্যয় ২০১৭ সালে ছিল ৩ দশমিক ৯ ডলার (পিপিপি), ২০২৫ সালে যাহা ৪ দশমিক ৫৯ ডলারে পৌঁছাইয়াছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ব্যয়ের বড় অংশই মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফল ও শাকসবজি কেনায় ব্যয় হয়। ফলে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা একপ্রকার সোনার হরিণ। এই অবস্থায় অধিকাংশ শিশুই প্রয়োজনীয় সকল খাদ্যশ্রেণির খাবার পাইতেছে না; ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালে পাঁচ বৎসরের কম বয়সী শিশুদের ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বা প্রায় ১৭ লাখ ওয়েস্টিং বা তীব্র ক্ষীণতায় ভুগিয়াছে এবং ২৫ দশমিক ১ শতাংশ বা প্রায় ৪২ লাখ শিশু ছিল খর্বাকৃতির। স্পষ্টত, সুস্থ সবল জাতি গঠনের স্বপ্নও ভঙ্গুর অবস্থায় আছে।

আমরা মনে করি, এই বাস্তবতায় সরকারের এখনই সমন্বিত প্রস্তুতি লইতে হইবে। ইউরিয়া সারসহ কৃষি উপকরণের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করিতে উদ্যোগ বাড়াইতে হইবে। পাশাপাশি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, উন্নত বীজ এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবার মাধ্যমে উৎপাদন ধরিয়া রাখিবার উদ্যোগেরও বিকল্প নাই। খাদ্যশস্যের সরকারি মজুত বৃদ্ধি করা, ন্যায্যমূল্যে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি জোরদার করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণ করিতে হইবে। পুষ্টির ঘাটতি নিরসনের সহিত সকলের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করিবার সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনাও জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। প্রয়োজনে এই সকল দিক হইতে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করিয়া বিশেষ কার্যক্রম চালাইতে হইবে।

আরও পড়ুন

×