ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

পদোন্নতি

বৈষম্যের চক্রে জনপ্রশাসনে সংস্কার

বৈষম্যের চক্রে জনপ্রশাসনে সংস্কার
×

সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা, উন্নয়ন-অগ্রগতি এগিয়ে নেওয়া এবং সুশাসন নিশ্চিত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো জনপ্রশাসন। সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু প্রশাসনই রাষ্ট্রের নীতি বাস্তবায়নের স্থায়ী বাহন। তাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও ন্যায়সংগত সুযোগের নিশ্চয়তা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বারবার দেখা গেছে, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে যায়। পরিবর্তিত হয় সুবিধাভোগী ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের তালিকা; কিন্তু যে কাঠামো বৈষম্য সৃষ্টি করে, সেটি প্রায় অপরিবর্তিত থেকে যায়।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক সরকারের আগমনে প্রশাসনে সংস্কারের একটি বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের মাধ্যমে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে পূরণের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এটি সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠার পথে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চাকরিতে প্রবেশের পর একজন কর্মকর্তার কর্মজীবনও কি একইভাবে মেধা, কর্মদক্ষতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে?

বাস্তবতা বলছে, উত্তরটি এখনও আশাব্যঞ্জক নয়।

অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সময়ে পদোন্নতিবঞ্চিত হিসেবে বিবেচিত শত শত কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে এক ধরনের প্রশাসনিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দীর্ঘদিন বঞ্চিত ব্যক্তিদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। সেই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, কী মানদণ্ডে কারা প্রকৃত বঞ্চিত হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন এবং কোন প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে–এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে পুরোনো বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ থেকেই নতুন বৈষম্যের অভিযোগ জন্ম নিয়েছে।

একই চিত্র নতুন সরকারের সময়ও দৃশ্যমান। নির্বাচনের পর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই পদোন্নতির ক্ষেত্রে শূন্য পদের সংখ্যা, মূল্যায়নের মানদণ্ড কিংবা দায়িত্ব বণ্টনের পরিকল্পনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে–পদোন্নতি কি প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে, নাকি রাজনৈতিক বিবেচনায়?
প্রশাসনে আরেকটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলো ‘পদ ছাড়াই পদোন্নতি’। অনুমোদিত পদের তুলনায় অনেক বেশি কর্মকর্তাকে একই পদমর্যাদা দেওয়া হলে পদমর্যাদা ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়। কর্মকর্তা পদোন্নতি পেলেও আগের দায়িত্বেই থেকে যান। এতে একদিকে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে পদোন্নতি একটি পেশাগত স্বীকৃতির পরিবর্তে প্রশাসনিক অসন্তোষ সামাল দেওয়ার উপকরণে পরিণত হয়।
আরও গভীর সংকট রয়েছে ক্যাডার বৈষম্যে। প্রশাসন ক্যাডার ও অন্যান্য বিশেষায়িত ক্যাডারের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ আজও অমীমাংসিত। উপসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে প্রশাসন ক্যাডারের প্রাধান্য অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ‘সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস’ গঠন কিংবা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চ প্রশাসনে নিয়োগের প্রস্তাব আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ফলে বিশেষজ্ঞভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার সুযোগও সীমিত রয়ে গেছে।

ওএসডি, বাধ্যতামূলক অবসর এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রশ্নেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এক সরকারের পছন্দের কর্মকর্তা পরবর্তী সরকারের কাছে অযোগ্য হয়ে যান; আবার নতুন সরকারের পছন্দের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। এতে প্রশাসনে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়–যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রশাসনের নিরপেক্ষতার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
অবশ্য প্রশাসনে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকও রয়েছে। নারী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বেড়েছে। নারী জেলা প্রশাসক, ইউএনও এবং সচিবের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে এটিকে টেকসই করতে হলে নির্দিষ্ট নীতি, লক্ষ্য এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা প্রয়োজন। একইভাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কেও নিয়মিত তথ্য প্রকাশ ও পরিকল্পিত অগ্রগতি নিশ্চিত করা জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন দুই শতাধিক সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে সরকার যে ১৮টি সুপারিশকে জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, সেগুলোর অধিকাংশই আজও বাস্তবায়ন হয়নি। পাসপোর্টে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাতিল কিংবা কিছু নাগরিক সেবায় উন্নতি প্রশংসনীয় হলেও প্রশাসনের ক্ষমতা বণ্টনের মূল কাঠামো–স্বাধীন জনপ্রশাসন কমিশন, পদোন্নতির স্বচ্ছ নীতি, ক্যাডার পুনর্বিন্যাস, ওএসডি–এখনও অনিষ্পন্ন।

মূল সমস্যা এখানেই। ব্যক্তি বদলেছে, সরকার বদলেছে, সুবিধাভোগী ও বঞ্চিতদের তালিকাও বদলেছে। বৈষম্য তৈরির কাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরেও নতুন করে পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হচ্ছে। এটি শুধু প্রশাসনের মনোবলই ক্ষুণ্ন করে না; রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও সেবাদান ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে।
বাংলাদেশের জনপ্রশাসনকে সত্যিকার অর্থে বৈষম্যমুক্ত করতে হলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য। পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, শাস্তি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, পূর্বঘোষিত ও আপিলযোগ্য নীতি থাকতে হবে। রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, মেধা, কর্মদক্ষতা ও সততাই হতে হবে মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড। রাষ্ট্রের প্রশাসন কোনো সরকারের নয়; এটি জনগণের। সেই সত্য যতদিন বাস্তব নীতিতে প্রতিফলিত না হবে, ততদিন পুরোনো বৈষম্য দূর হলেও নতুন বঞ্চনার জন্ম হতে থাকবে। 

সাব্বির নেওয়াজ : বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল
[email protected]

আরও পড়ুন

×