ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

বেসরকারি নিরাপত্তা খাতের সম্ভাবনা

বেসরকারি নিরাপত্তা খাতের সম্ভাবনা
×

মো. আশেক কামাল

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতি বছর ২৪ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রহরী দিবস। ‘২৪ জুলাই’ বা ‘২৪/৭’–অর্থাৎ সপ্তাহের সাত দিন, দিনের চব্বিশ ঘণ্টা অবিরাম দায়িত্ব পালনের প্রতীক। যখন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ বিশ্রামে থাকে, তখনও একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা তাঁর দায়িত্বে অটল থাকেন। 

জাতিসংঘ ঘোষিত কোনো আন্তর্জাতিক দিবস না হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তাশিল্প, পেশাজীবী সংগঠন এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো দিনটি পালন করে থাকে। এর মূল উদ্দেশ্য, নিরাপত্তা পেশাকে যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা, পেশাজীবীদের অবদানের স্বীকৃতি আদায়, নিরাপদ কর্মপরিবেশসহ তাদের বিভিন্ন অধিকার নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশে বেসরকারি নিরাপত্তাশিল্প গত তিন দশকে একটি বৃহৎ কর্মসংস্থানমুখী সেবাখাতে পরিণত হয়েছে। দেশের শিল্পকারখানা, তৈরি পোশাকশিল্প, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এটিএম বুথ, করপোরেট অফিস, আবাসিক প্রকল্প, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দূতাবাস, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রতিদিন হাজার হাজার নিরাপত্তা কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। 
এই খাত শুধু সম্পদ পাহারা দেয় না; এটি ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে, উৎপাদনব্যবস্থাকে সচল রাখে, কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এছাড়া, বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, মূল্যবান নথি, এটিএম রিফিল, ব্যাংকিং সম্পদ এবং সংবেদনশীল উপকরণ নিরাপদে পরিবহন করা হয়।
এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার পরও বাংলাদেশের অধিকাংশ নিরাপত্তা প্রহরীর জীবনমান অত্যন্ত সাধারণ। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সীমিত বেতন, স্বাস্থ্যসেবার অভাব, পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ না থাকা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং সামাজিক স্বীকৃতির সংকট–এসব আজও বিদ্যমান। সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। শ্রম আইনের আশ্রয়ও তারা পান না। 

একটি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ড, চুরি, দুর্ঘটনা, সহিংসতা, চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা কিংবা অন্য যেকোনো সংকটের সময় প্রথমে এই নিরাপত্তা প্রহরী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকেন। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কিংবা অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর আগে তিনিই পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন, মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন, জরুরি সহায়তা প্রদান করেন, প্রাথমিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন, ভিড় নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করেন। একজন দক্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বাস্তবে একটি শক্তি বর্ধক (ফোর্স মাল্টিফ্লায়ার) হিসেবে কাজ করতে পারেন। 

যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে তাদের আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তারা দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার শক্তিশালী অংশীদারে পরিণত হতে পারেন।
আধুনিক পুলিশিংয়ে বহুল ব্যবহৃত একটি ধারণা হলো, পরিবেশগত নকশার মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধ। এই ধারণার মূল বক্তব্য হলো–একটি স্থাপনার নকশা, আলোকসজ্জা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ব্যবস্থা, মানুষের চলাচল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে এমনভাবে সাজানো, যাতে অপরাধ সংঘটনের সুযোগই কমে যায়। প্রশিক্ষিত বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই ধারণার আলোকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হলে নগর নিরাপত্তা, শিল্প নিরাপত্তা এবং আবাসিক নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন, ভাষা দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জন্য মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। 
উন্নত দেশগুলোর মতো এখানেও নিরাপত্তাশিল্পের জন্য পৃথক লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত অডিট, আচরণবিধি এবং পেশাগত মানদণ্ড চালু করা যায়। একে জাতীয় নিরাপত্তাসম্পৃক্ত খাত হিসেবে বিবেচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি।

মেজর (অব.) মো. আশেক কামাল: নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ; নেস্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। 
[email protected]

আরও পড়ুন

×