দক্ষিণ এশিয়া
জেনজি আন্দোলন থেকে পাকিস্তানের শিক্ষা
জাহিদ হোসেন
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ ও নেপালের মতো সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে না পারলেও ভারতের জেনজি আন্দোলন ক্রমবর্ধমান দমনপীড়নমূলক ব্যবস্থাকে ঠিকই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। শিক্ষার্থী ও ক্ষুব্ধ তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের মূল অনুঘটক ছিল বহুল আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁস। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এবং এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা বহু তরুণ-তরুণীর আত্মহত্যার বিচারের দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়। নজিরবিহীন এই বিক্ষোভ প্রথমে দিল্লিতে শুরু হলেও দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তা ছড়িয়ে পড়ে।
খুব দ্রুতই এটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রূপ নেয় এবং সমাজের অন্যান্য স্তরের মানুষের সমর্থন লাভ করে। নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনামলে তাঁর সরকারের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ এটি। পাশাপাশি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে যারা ধীরে ধীরে ক্ষুণ্ন করেছে, সেই কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রশাসনের ভেতরে এটি বড় ফাটল ধরিয়েছে। এই বিক্ষোভ ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করে, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শক্তিশালী নেতা হিসেবে ভাবমূর্তির জন্য এক চরম অপমানজনক ধাক্কা। যদিও আন্দোলন শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে, তবুও এটি বাড়বাড়ন্ত স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশে তরুণদের অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পোষ্যদের জন্য বৈষম্যমূলক চাকরির কোটার বিরুদ্ধে। এটি দ্রুত একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা এক কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। শেখ হাসিনার সরকার শক্তি প্রয়োগ করে শত শত বিক্ষোভকারীকে হত্যা করলে জনরোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতিতে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন, যা ছিল এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বিজয় এবং একটি অবাধে নির্বাচিত সরকারের পূর্বসূরি।
একইভাবে নেপালের জেনজি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল সরকারের সমালোচনামূলক সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে। এই পদক্ষেপে অভিজাতদের নগ্ন প্রভাব, ব্যাপক দুর্নীতি এবং ক্রমবর্ধমান যুব বেকারত্বের বিরুদ্ধে জমতে থাকা গভীর ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ দমন করার সরকারি নিষ্ঠুর চেষ্টা মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তোলে। এটি নেপালের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস বেসামরিক হত্যাকাণ্ড, যেখানে বহু মানুষ প্রাণ হারান। ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবন এবং বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। কদিনের মধ্যেই পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী; সেনাবাহিনী সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে। এরপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। কয়েক মাস পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং একজন তরুণ নেতা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হন। একটি সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে পুরো ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে পড়েছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কায়ও ২০২২ সালে তরুণদের আন্দোলনে সরকারের পতন হয়। শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের অভ্যুত্থান, যা ‘আরাগলায়’ বা সংগ্রাম নামে পরিচিত। দেশটির আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় প্রতিবাদ এটি। ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালের মতো একক কোনো ঘটনায় এই আন্দোলন শুরু হয়নি। বরং শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিস্ফোরণ। এই সংকট কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি পরিবারতান্ত্রিক রাজবংশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফসল, যারা দেশের রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার এই চারটি দেশে যা ঘটে চলেছে, তা পাকিস্তানের জন্য একটি বড় শিক্ষা। কারণ একদিকে পাকিস্তানের রয়েছে বিপুলসংখ্যক তরুণ, অন্যদিকে রয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। ধারণা করা হয়, পাকিস্তানের জেনজি প্রজন্মের, যাদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে– সংখ্যা প্রায় সাত কোটি। যে দেশে মৌলিক অধিকার বিপন্ন, সংবাদমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা সীমিত এবং বেকারত্ব ঊর্ধ্বমুখী, সেখানে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ইঙ্গিত। একটি ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিগত লভ্যাংশ খুব সহজেই একটি জনমিতিগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। এর ফলে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার মানব উন্নয়ন সূচকের একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকতে পারে। বিভিন্ন অঞ্চলে শাসকগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ হারাতে চলেছে এবং তাদের শাসন ব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল, যা তাদের আর্থিক স্বাধীনতা খর্ব করছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক দমনপীড়নের কারণে সৃষ্ট জনঅসন্তোষ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অস্থির করে তুলেছে।
বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপি) এবং আজাদ কাশ্মীরে যা ঘটছে, তা মূলত অভিজাতদের তৈরি ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। প্রযুক্তির এই যুগে তথ্য সীমিত করে রাখা সম্ভব নয়। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এসব উত্তেজনা অস্থিতিশীল এই আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে আরও সুদূরপ্রসারী পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই পাকিস্তানের উচিত অবিলম্বে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
জাহিদ হোসেন: লেখক ও সাংবাদিক; দ্য ডন থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- দক্ষিণ এশিয়া