ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমাজ

মতাদর্শের বিতর্ক বনাম তাৎক্ষণিকতার বিপদ

মতাদর্শের বিতর্ক বনাম তাৎক্ষণিকতার বিপদ
×

মামুনুর রশীদ

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৯ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

একবার ফ্রাঙ্কফ্রুর্ট থেকে কিউবার রাজধানী হাভানায় যাচ্ছিলাম। ১৯৯৩ সালের ঘটনা। কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক অবরোধ চলছিল। পাশে বসা এক জার্মান বিজ্ঞানী যাচ্ছিলেন ভেনেজুয়েলায়। কথায় কথায় জানতে চাইলেন, কেন হাভানায় যাচ্ছি। বললাম, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের বিরুদ্ধে ফিদেল কাস্ত্রো আয়োজিত একটি সংহতি সম্মেলনে যোগ দিতেই আমাদের এই যাত্রা। ভদ্রলোক প্রথমে হাসলেন, পরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। তাঁর বক্তব্য, একটি দেশ কোনো মতাদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা কী? তিনি বললেন, কিউবার মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে আছে। হয়তো তা খুব জৌলুসপূর্ণ নয়। কিন্তু অসাম্যও খুব কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়নে কিউবার চিকিৎসা ব্যবস্থা পৃথিবীর শীর্ষে। রাশিয়ার চেরনোবিলের দুর্ঘটনার পর শত শত দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে প্রচুর সংখ্যক মানুষ কিউবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। 

প্রসঙ্গটা তুললাম কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় নিপীড়নের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আমাদের উপমহাদেশেও চলছে বলে। এখানে এক রাজনৈতিক দল অন্য রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রতিহিংসায় সব সময়ই উন্মত্ত। সব সরকারই ক্ষমতায় থাকার সময় বিরোধী দলের ওপর নানা নিপীড়ন চালায়। কোনো মানবিক বিষয়ও বিবেচনা পায় না। আবার রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যেও বিশেষ করে শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের হেয় করার ঘটনা চলতে থাকে।

কিছু শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী একেবারেই দলীয় বিবেচনায় তাদের কাজকর্ম চালিয়ে থাকেন; তাদের কথা আলাদা। আবার নতুন কেউ ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে নিজেদের আশ্রয় খোঁজেন এবং দলের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে হালুয়া-রুটির ভাগাভাগিতে যুক্ত হয়ে যান। কিন্তু সমস্যায় পড়েন সেই সব মুক্ত ও স্পষ্টভাষী, যারা কোনো দলের সুযোগ সুবিধা না নিয়ে নিজেদের কাজটি করেন এবং যে কোনো সরকারেরই গণবিরোধী কাজের সমালোচনা করে থাকেন। তাদের নামে একটি কথাই উচ্চারিত হয়– উনি তো আমাদের লোক নন। নতুন ব্যবস্থায় যে কোনো বিষয়েই সরকারের সমালোচনা করতে গেলে বা অতীতের কোনো কার্যকলাপ বিষয়ে বলতে গেলে মুহূর্তেই তারা দুই দলেরই শত্রুতে পরিণত হন। শুধু সমালোচনা নয়, এক ধরনের চরিত্র হননও শুরু হয়। চরিত্র হননে সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে ফেসবুকে অবিরাম ট্রল হতে থাকে।

যে কোনো নাগরিকের সমালোচনা করার অধিকার আছে। কিন্তু সমালোচনা যদি মতাদর্শভিত্তিক না হয়ে একেবারেই ব্যক্তি আক্রমণের জায়গা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এসব মানুষ কোথায় দাঁড়াবে? জানি, এখন রাজনৈতিক দলগুলোতে মতাদর্শের বিষয়টি উপেক্ষিত এবং যারা নতুন ফেসবুকে কলম ধরেছেন, তাদের কাছে এসব মূল্যহীন। ব্যক্তি আক্রমণই প্রধান অস্ত্র। সমাজ বিকাশে এবং ব্যক্তির মনন গঠনে বিভিন্ন মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা যদি হয় ভ্রান্ত পথে, তাহলে তার কোনো সামাজিক উপযোগিতা থাকে না। 

লেখক জাকির তালুকদার আসাদুজ্জামান নূর সম্পর্কে অনেক সমালোচনা করেছেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তাঁর ব্যর্থতার বিষয়েও সরাসরি লিখেছেন। কিন্তু এই বয়সে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে আসাদুজ্জামান নূর যখন কারাগারে তখন তিনি তাঁর জামিনে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য জোরালোভাবেই লিখেছেন। আসাদুজ্জামান নূরের দলীয় রাজনীতি করার আমিও একজন সমালোচক। প্রায় সমান বয়সী আমরা নানাভাবে তাঁকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছি এবং বেশ কিছু কল্যাণকর কাজের সুপারিশ দিয়েছি। কিন্তু তাঁর কাছে শিল্পের শক্তির চাইতে রাজনৈতিক শক্তিকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, যদিও মঞ্চ, টেলিভিশন এবং আবৃত্তিতে তিনি তাঁর শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। জাকির তালুকদারের মতো আমিও মনে করি, আইনে যদি জামিনের ব্যবস্থাটি থাকে, তাহলে আসাদুজ্জামান নূরের ক্ষেত্রে সেটি কেন প্রয়োগ করা হবে না?

এই কথাটুকু বলার জন্য যদি আমরা সাবেক সরকারের লোক হয়ে যাই, তা কোন বিচারে বা মানদণ্ডে দেখব? আমাদের রাজনীতি জাতিকে বিভক্ত করেছে। আর যারা ফেসবুকের পাতা ভরিয়ে দিনের পর দিন ব্যক্তি-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন, তারাও এই বিভক্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলছেন।

সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকার গোলটেবিলে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেক্টরের মানুষ এবং শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। সরকারের একজন মন্ত্রীও ছিলেন। শিল্পীরা তাদের সমস্যার কথা বলেছেন; সরকারি ব্যক্তিরাও তাদের কথা বলে গোলটেবিলকে সার্থক করার চেষ্টা করেছেন। শিল্পীরা একটা ফোরামে কথা বলছেন, তবে কে বলছেন তার চাইতে ‘কী’ বলছেন, সেটা কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়? আমরা তো চেয়েছি সরকার ও বিরোধী দল সংসদ এবং সংসদের বাইরেও আলোচনায় থাকবে এবং সেখানে মুক্তচিন্তার মানুষরাও থাকবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমাদের রাজনীতিতে ক্ষত্রিয়দের আধিপত্য। আমি থাকলে তুমি নেই; তুমি থাকলে আমি নেই।

শাসকগোষ্ঠী ১৯৯১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত দ্বিদলীয় শাসন ব্যবস্থার মধ্যে ছিল। তারপর একদলীয় শাসন ব্যবস্থা এলো। এই একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় বিরোধী দল হিসেবে যারা থাকে তারা কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা পায় না। তারাও নানা বাস্তবতায় নিপীড়নে একসময় সাময়িক হলেও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এটি রাজনীতির জন্য সব সময়ই এক অশনিসংকেত। যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিপুল কর্মী এবং সমর্থক আছে, তাদের রাজনীতি করার অধিকার থাকতে হবে। তারা সংসদে যেমন বিতর্ক করবেন, তেমনি রাজপথেও তাদের দাঁড়াতে দিতে হবে। অতীতে সেটি হয়নি বলে একটা বিপর্যয় শুরু হয়েছিল। যারা সমর্থক তাদের সমালোচনার ভাষাও যথেষ্ট রুচির পরিচায়ক হতে হয়। কিন্তু বহু বছর ধরে আমাদের জীবনে যে রুচির দুর্ভিক্ষ এসেছে, তা রোধ করার ক্ষমতা যেন আমরা হারিয়েই বসেছি। এর মধ্যে ঢুকে গেছে ভয়ের সংস্কৃতি। ওই সরকারের আমলে কিছু বলা যেত না। কারণ তাতে জীবন সংশয় হতো। আবার এই সরকারের আমলেও সেই বাস্তবতা রয়ে গেছে– কখন মুহাম্মদ ইউনূসের মব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে! 

মুক্তচিন্তার মানুষদের কোনো দল থাকে না। তাই তাদের মধ্যে মবের ভয় পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। মবের চর্চা এখনও চলছে। প্রকাশ্যে বেশি না হলেও অপ্রকাশ্যে মব কিন্তু জেগে আছে। রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সভ্যতার দাবি। কিন্তু এই দাবি বারবারই অগ্রাহ্য হচ্ছে। নিরাপত্তার এই গুরুতর সমস্যাটি আমাদের বর্তমান শাসকরাও জানেন। কারণ তাদের কর্মী এবং নেতারা নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ কেউ প্রাণ দিয়েছেন। মানুষের প্রাণ এক অমূল্য সম্পদ। এই প্রাণ রক্ষা করাও রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রের পরিচালনাকারীদের গুরুদায়িত্ব।

আমাদের জীবনে এমন পরিস্থিতি এসেছে, যখন অভিভাবকরা সংকটে থেকেছেন– তাঁর সন্তানরা আবার ঘরে ফিরতে পারবে তো। এই ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন। সেই সঙ্গে খেলতে খেলতে বা আবেগের বশবর্তী হয়ে সামাজিক মাধ্যমকে আমরা এমন উত্তপ্ত করে তুলব না, যাতে মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়ে। আর যারা সচেতন নাগরিক তাদেরও জনকল্যাণমুখী মতাদর্শকে পাহারা দিতে হবে। তাৎক্ষণিকতায় আক্রান্ত হয়ে আমরা যেন বড় কোনো ভুল না করে ফেলি।

মামুনুর রশীদ: নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×