ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি: বাংলাদেশের সংকট 

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি: বাংলাদেশের সংকট 
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ২০:৫৪

বাংলাদেশের বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য কোনো সমন্বিত নীতি নেই। বিশ্বে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৮ কোটি ৩৪ লাখ বলে জানাচ্ছে বাস্তুচ্যুতির ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি) ও নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল (এনআরসি)–এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন। সংঘাত, রাজনৈতিক সহিংসতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আজ কোটি কোটি মানুষ নিজ দেশের ভেতরেই বাসস্থান হারিয়ে অনিশ্চয়তার জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁরা শরণার্থী নন, কারণ তাঁরা আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেননি। কিন্তু মানবিক বিপর্যয়, অধিকারহানি এবং অনিশ্চয়তার দিক থেকে তাঁদের দুর্দশা কোনো অংশেই কম নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা আরও বেশি অদৃশ্য, কারণ আন্তর্জাতিক শরণার্থী সুরক্ষা কাঠামো তাঁদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা ও সুদানের মতো অঞ্চলগুলোতে সংঘাতের পাশাপাশি বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ২০১৮ সালের পর থেকে গত ছয় বছরে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আইডিএমসি এবং এনআরসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্বে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়া ৮ কোটি ৩৪ লাখ মানুষের মধ্যে ৯০ শতাংশ বা ৭ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ সংঘাত ও সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ২০১৮ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ৮০ শতাংশ বেড়েছে। ১০টির মতো দেশের প্রতিটিতে ৩০ লাখের বেশি মানুষ সংঘাত ও সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে গৃহযুদ্ধকবলিত সুদানের অবস্থা বেশি খারাপ। সেখানে ১ কোটি ১৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। 

বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির প্রধান কারণ যদিও যুদ্ধ নয়; এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উপকূলীয় লবণাক্ততা। প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে দেশের বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে ঢাকায়, আশ্রয়ের সন্ধানে আসছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই মানুষগুলোকে আমরা ‘বাস্তুচ্যুত নাগরিক’ হিসেবে দেখি না; দেখি বস্তিবাসী, অবৈধ দখলদার কিংবা নগরায়ণের বোঝা হিসেবে। এখানেই বাংলাদেশের নীতি ও মানবাধিকার চর্চার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বলা যেতে পারে। 

ঢাকার বস্তিগুলোর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে জীবন ও জীবিকার তাগিদে গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা মানুষের হাত ধরে। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষ, ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার কিংবা দারিদ্র্য ও পরিবেশগত বিপর্যয়ে স্থানচ্যুত জনগোষ্ঠীর কাছে এসব বস্তি কোনো পছন্দের আবাসন নয়; বরং বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। ফলে বস্তিকে শুধু নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে বাস্তুচ্যুতির মূল কারণ ও মানবাধিকার প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যায়। আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাঁরা এখনও একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে যথাযথ স্বীকৃতি পাননি। 

এখানেই মানবাধিকার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি পরিবার যখন নদীতে তার বসতভিটা হারায়, তখন সে কেবল জমির মালিকানা হারায় না; সে হারায় নিরাপদ আবাসনের অধিকার, জীবিকার সুযোগ, সন্তানের শিক্ষার ধারাবাহিকতা, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তি। অর্থাৎ বাস্তুচ্যুতি একযোগে একাধিক মৌলিক মানবাধিকারকে বিপন্ন করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে জীবন, মর্যাদা, বাসস্থান, খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বৈষম্যহীনতার অধিকার অবিচ্ছেদ্য। ফলে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি নিছক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি একটি গভীর মানবাধিকার ইস্যু। 

জাতিসংঘের ‘অভ্যন্তরীণ বাস্তচ্যুতি-সংক্রান্ত নির্দেশনামূলক নীতিমালা’ রাষ্ট্রের ওপর স্পষ্ট দায়িত্ব অর্পণ করেছে–বাস্তুচ্যুতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। যদিও এই নীতিমালা আইনি দৃষ্টিতে বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের স্বীকৃত মানদণ্ড হিসেবে বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশের মতো মানবাধিকার-সম্পর্কিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির পক্ষভুক্ত একটি রাষ্ট্রের জন্য এই নীতিমালার চেতনাকে জাতীয় নীতিতে প্রতিফলিত করার গুরুত্ব রয়েছে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগামী দশকগুলোতে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের বাস্তুচ্যুতি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা যায়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি? আমাদের নগর পরিকল্পনা, আবাসননীতি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কিংবা কর্মসংস্থান পরিকল্পনায় কি বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো সুস্পষ্ট কৌশল রয়েছে? দুঃখজনক হলেও উত্তরটি আশাব্যঞ্জক নয়। 
বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-এর মূল অঙ্গীকার হলো– কাউকে পেছনে ফেলে নয়। অথচ বাস্তুচ্যুত মানুষেরাই প্রায়ই সেই জনগোষ্ঠী, যারা উন্নয়ন ও সুরক্ষা–উভয় ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়েন। 
এখন আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় নীতি, যেখানে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের স্বীকৃতি, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপদ আবাসন, জীবিকা পুনর্গঠন, শিশুর শিক্ষা, নারীর নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনকে একই কাঠামোর আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলা জরুরি। বাস্তুচ্যুত মানুষকে কেবল ত্রাণের গ্রহীতা হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে।
যেহেতু অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি আগামী দিনের বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। সে কারণে এই সংকটকে যদি আমরা কেবল দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করা হবে না। রাষ্ট্রের প্রকৃত মানবিকতা পরিমাপ হয় সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের প্রতি তার আচরণে। বাংলাদেশ উন্নয়নের যে গল্প বিশ্বকে শোনাতে চায়, সেই গল্প শোনানো সম্ভব হবে যখন উন্নয়নের মানদণ্ড শুধু স্থাপনা নয়, নির্ধারণ হবে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়। 
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকার কর্মী 

আরও পড়ুন

×