ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক

মক্কা চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তার নতুন রূপরেখা

মক্কা চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তার নতুন রূপরেখা
×

আলী আওয়াদ আসসেরি

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত শুক্রবার সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর আমাদের অঞ্চলের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। মক্কায় যখন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ একত্রিত হন, তখন তারা মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী তিনটি দেশের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলেন। এই চুক্তির মূল অঙ্গীকার স্পষ্ট– যে কোনো দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে বাকিদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর উদ্দেশ্যও একইভাবে পরিষ্কার– আগ্রাসন রোধ, যৌথ নিরাপত্তা জোরদার এবং অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা।

এ নিয়ে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব তুলে ধরেছে। অঞ্চলের একটি অত্যন্ত কঠিন মুহূর্তে তিন দেশের শীর্ষ নেতাদের একসঙ্গে হতে দেখে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের জনগণের মধ্যে আনন্দ ও গর্বের অনুভূতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ইমান, ইতিহাস ও দীর্ঘদিনের সংহতির ওপর ভিত্তি করে একটি বিশেষ সম্পর্ক আগেই তৈরি ছিল। অন্যদিকে তুরস্কের রয়েছে উভয় দেশের সঙ্গেই গভীর ঐতিহাসিক ও আত্মিক টান। মক্কা এখন এই সম্পর্কের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও নতুন কৌশলগত মাত্রা যোগ করল।
কিছু বাইরের পর্যবেক্ষক এ চুক্তিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বা নতুন ‘সুন্নি জোট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে এ জাতীয় সংজ্ঞা চুক্তির মূল উদ্দেশ্য প্রকাশে ব্যর্থ। এই চুক্তি ইরান, ইসরায়েল কিংবা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়। এটি কোনো সম্প্রদায়গত জোট বা অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনাও নয়। এটি তিনটি সার্বভৌম দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি, যারা তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার পরিবেশকে দ্রুত অবনতি হতে দেখে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আগ্রাসন ঠেকানোর সামর্থ্য বাড়াতে একমত। তারা যুদ্ধ চায় না, তবে একসঙ্গে শান্তি রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

চলমান ইরান সংঘাতের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সময় নির্বাচন নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। তবে সময়ের প্রেক্ষাপটকে মূল উৎসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। এই চুক্তির জন্য বিস্তারিত আলোচনা চলে আসছিল বছরের পর বছর। গত সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত সৌদি-পাকিস্তান কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে চলা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার চূড়ান্ত রূপ। একইভাবে পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যেও দীর্ঘদিনের জোরালো সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি-তুর্কি প্রতিরক্ষা সমিতিও ধারাবাহিকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। 
তুরস্কের এতে যুক্ত হওয়া হঠাৎ বর্তমান সংঘাতের কারণে ঘটেনি। তবে সাম্প্রতিক সংকট প্রক্রিয়াকে গতি দিয়েছে। কারণ এটি একটি সুনির্দিষ্ট ও সুসংগঠিত আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বেশ স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। 

ঠিক এখানেই প্রিন্স সালমানের গতিশীল এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের বিশেষ স্বীকৃতি দিতে হয়। নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা হয় সংকটকালে যখন চরম চাপের মুখে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যার প্রভাব আগামী কয়েক দশক পর্যন্ত ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে। একজন বুদ্ধিমান নেতাকে ইতিহাসের পাঠ বুঝতে হয়; বর্তমানের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে হয় এবং ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে তা অনুমান করার সক্ষমতা রাখতে হয়। প্রিন্স ঠিক এসব গুণেরই প্রমাণ দিয়েছেন।
চুক্তিটি মক্কায় স্বাক্ষরিত হওয়া তাৎপর্যবহ। বিশ্বজুড়ে সব মুসলিমের কাছে এই পবিত্র শহরটি ঐক্যের প্রতীক; এমন এক বন্ধন যা জাতীয়তা ও ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে যায়। পাকিস্তানে আমার দেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে প্রায় এক দশক কাজ করার সুযোগে আমি নিজে দেখেছি পাকিস্তানের মানুষ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং সৌদিরা পাকিস্তানকে কতটা ভালোবাসে। একইভাবে তুরস্কের সঙ্গেও উভয় দেশের গভীর ঐতিহাসিক ও আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এ চুক্তি ঘিরে জনগণের যে উল্লাস, তা কেবল কূটনীতির ফসল নয়; বরং তিন ভ্রাতৃপ্রতিম জাতির পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ফল।

গত বছর কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সৌদি-পাকিস্তান সামরিক সম্পর্ককে একটি বাধ্যবাধকতামূলক প্রতিশ্রুতিতে রূপ দিয়েছিল। চলতি বছর সাম্প্রতিককালের অন্যতম কঠিন নিরাপত্তা সংকটের পর মক্কা চুক্তি সেই লক্ষ্যকে আরও বিস্তৃত করল। প্রিন্স ধৈর্য ধরেছেন যখন ধৈর্যের প্রয়োজন ছিল; দৃঢ়তা দেখিয়েছেন যখন সৌদি স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন এসেছে এবং ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। পাকিস্তান ও তুরস্কের নেতৃত্বের সঙ্গে মিলে তিনি এখন এমন এক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছেন, যার গুরুত্ব কেবল চুক্তিকালের কঠিন পরিস্থিতির বিচারে নয়, বরং আগামী দশকগুলোতে এটি যা অর্জন করতে পারবে তার বিচারে পরিমাপ করা উচিত।

ড. আলী আওয়াদ আসসেরি: পাকিস্তান ও লেবাননে সৌদি আরবের সাবেক রাষ্ট্রদূত; আরবনিউজ থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×