রাইট টার্ন
এআই যুগেও ‘বাইতুল হিকমা’ যেভাবে সম্ভব
মোহাম্মদ গোলাম নবী
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হচ্ছে? শিক্ষামন্ত্রী বলছেন মূল্যায়ন যথাযথভাবে হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন বোর্ডের ফল বিশ্লেষণে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার বিষয়টি সামনে আসছে। প্রশ্ন উঠেছে, এর মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার দুর্বলতাও কি প্রকাশ পাচ্ছে? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই ফল থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কী শিখবে?
কিছুদিন আগেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া, প্রশ্নপত্রে ভুল, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক হয়েছে। কখনও পাঠ্যক্রম, কখনও পাঠ্যবই, শিক্ষক নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কিংবা শিক্ষিত বেকারত্ব; আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো না কোনো ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রে থাকছেই। কিন্তু কিছুদিন আলোচনা হয়। শিক্ষা প্রশাসন প্রতিক্রিয়া জানায়। তারপর আরেকটি ঘটনা এসে মনোযোগ সেদিকে নিয়ে যায়। এখানে একটি প্যাটার্ন স্পষ্ট। প্যাটার্ন ভাঙা দরকার।
আমরা ঘটনা নিয়ে শুধু আলোচনা করি। ঘটনাগুলোকে একসঙ্গে রেখে শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের সমস্যার ধরন খুঁজে দেখি কি? প্রতিটি ঘটনা থেকে পাওয়া তথ্য ও অভিজ্ঞতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত, বিশ্লেষিত এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তে ব্যবহার করা দরকার। অর্থাৎ তথ্য থেকে বিশ্লেষণ, বিশ্লেষণ থেকে শেখা, শেখা থেকে জ্ঞান এবং জ্ঞান থেকে নীতি– এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার চর্চা দরকার।
এমনটা না হওয়ার কারণ খুঁজতে গেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। মন্ত্রণালয়কে শুধু ‘শিক্ষা প্রশাসন’ হিসেবে দেখলে চলবে না। সরকারকে বুঝতে হবে পরীক্ষা নেওয়া, প্রশ্নপত্র তৈরি, ফল প্রকাশ, শিক্ষক নিয়োগ-বদলি কিংবা দৈনন্দিন সংকট সামলানো গুরুত্বপূর্ণ হলেও এসবের জন্য সচিবালয়, অধিদপ্তর, শিক্ষা বোর্ড এবং প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজ আরও বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা।
আজ যে শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করল; ২০৪০ বা ২০৫০ সালের পৃথিবীতে তার জন্য কী ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন হবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন মানুষের অনেক প্রচলিত কাজ করে দেবে, তখন আমাদের বিদ্যালয় কী শেখাবে? বিশ্ববিদ্যালয় কী ধরনের জ্ঞান সৃষ্টি করবে? কারিগরি শিক্ষা কীভাবে বদলাবে? শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তাই একই সঙ্গে দুটি সময় নিয়ে কাজ করতে হয়– আজ এবং আগামীকাল।
এবারের এসএসসির ফলকেও সেই বড় জায়গা থেকে দেখা যায়। প্রায় ৩৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী কেন মাধ্যমিকের ন্যূনতম উত্তীর্ণ মান অর্জন করতে পারল না? কোন বিষয়ে তারা পিছিয়ে? কেন পিছিয়ে? অঞ্চল, বিদ্যালয়, শিক্ষক, পারিবারিক অবস্থা কিংবা শিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে এর সম্পর্ক কী? একটি ফল তখন শুধু পাস-ফেলের পরিসংখ্যান থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানার একটি বড় তথ্যভান্ডার।
কিন্তু তথ্য নিজে জ্ঞান নয়। তথ্যকে বিশ্লেষণ করতে হয়। কারণ খুঁজে শিখতে হয়। সেই শেখাকে গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে জ্ঞানে রূপান্তর করতে হয়। তারপর সেই জ্ঞানকে নীতিতে নিতে হয়। নীতি বাস্তবায়নের ফল থেকে আবার শিখতে হয়। এটি একটি চক্র। দেশে এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার চর্চা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
ইতিহাসে জ্ঞানকে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার কেন্দ্রে রাখার অসাধারণ উদাহরণ নবম শতকের বাগদাদের ‘বাইতুল হিকমা’ বা জ্ঞানগৃহ। এটি শুধু গ্রন্থাগার ছিল না; অনুবাদ, গবেষণা, জ্ঞান বিনিময় এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিরও কেন্দ্র। গ্রিক, পারস্য, সিরীয় ও ভারত উপমহাদেশের জ্ঞান সেখানে অনূদিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হয়েছে। এর মৌলিক দর্শন ছিল– জ্ঞান রাষ্ট্রের সম্পদ।
এখন রাষ্ট্র যেমন সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ বা বন্দরে বিনিয়োগ করে; তেমনি জ্ঞান উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রয়োগেও বিনিয়োগ করতে হয়। আমরা এখনও সেখানে যেতে পারিনি। কিন্তু সেখানেই যেতে হবে।
কোন জ্ঞান বিশ্বাসযোগ্য; কোনটি দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক এবং সেটি কীভাবে কাজে লাগানো যাবে; সেই সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। যেমন ধরা যাক, শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানতে চাইল– মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি ও গণিত শেখানোর কোন পদ্ধতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কার্যকর হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত গবেষণা ও অভিজ্ঞতা সামনে আনতে পারে। কিন্তু কোনটি দেশের জন্য উপযোগী, কোথায় পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং ফলাফল কীভাবে মূল্যায়িত হবে– সেই সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে।
আধুনিক বাইতুল হিকমা কোনো ভবন বা প্রতিষ্ঠান নয়; তা হতে হবে জাতীয় জ্ঞান ব্যবস্থা। সেখানে গবেষণা, অনুবাদ, মাঠের বাস্তবতা, উদ্ভাবন, নীতিনির্ধারণ এবং শেখা ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হবে।
এই জাতীয় জ্ঞান ব্যবস্থার পাঁচটি ভিত্তি থাকতে পারে। এক. বিশ্বজ্ঞান বিশ্লেষণ ব্যবস্থা, যা বিভিন্ন দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবন সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবে। দুই. বাস্তবতা গবেষণাগার, যা বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া জ্ঞানকে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। তিন. নীতি পরীক্ষাগার, যেখানে নতুন ধারণা ছোট পরিসরে পরীক্ষা করে প্রমাণভিত্তিক নীতি তৈরি হবে। চার. অনুবাদ ও যোগাযোগ কেন্দ্র, যা প্রয়োজনীয় জ্ঞান সহজ বাংলায় সকলের কাছে পৌঁছে দেবে। পাঁচ. জাতীয় শিখনভান্ডার, যেখানে নীতির সাফল্য-ব্যর্থতা ও শিক্ষা সংরক্ষিত থাকবে।
কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠান নয়; সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজ হবে এর অংশীদার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে পারে এর সমন্বয়ক। তখন এসএসসি পরীক্ষার ফল, ব্যবস্থার সংকট কিংবা পাঠ্যক্রমের ভুল কয়েক দিন বিতর্ক তুলেই হারিয়ে যাবে না। বরং প্রতিটি ঘটনা হয়ে উঠবে শেখার উপাদান।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
- বিষয় :
- মোহাম্মদ গোলাম নবী