ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়া

নেপালের জেন-জি সরকার চমক হারাচ্ছে?

নেপালের জেন-জি সরকার চমক হারাচ্ছে?
×

বিকাশ ভট্ট ছেত্রী

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৪০

জেন-জি আন্দোলন-পরবর্তী পরিস্থিতি মূলধারার রাজনীতিতে জরুরি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। তা পুরোনো দলগুলোর– নেপালি কংগ্রেস, ইউএমএল এবং মাওবাদী (বর্তমানে এনসিপি) রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদারিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে। এর ফলে দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ডাক দেওয়া হয়, যা আরএসপি ব্র্যান্ডকে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে বসিয়ে দেয়। আরএসপির এই মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে ভাইরাল খণ্ডকালীন র‌্যাপার ও নেপালের সর্ববৃহৎ মহানগরীর পূর্ণকালীন মেয়র বলেন্দ্র শাহর।

মাধেশী সম্প্রদায় থেকে আসা শাহকে সামনে রাখা আরএসপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থিতার জন্য এক দুর্দান্ত বিপণন কৌশল ছিল; বিশেষ করে যখন জাতীয় ভোটের প্রায় ৫৮ শতাংশই আসে মাধেশ প্রদেশ থেকে। তাঁর প্রার্থিতা প্রচলিত প্রবীণতান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক প্রতিশোধেরও প্রতিনিধিত্ব করেছিল। দলটি শেষ পর্যন্ত ২৭৫টি প্রতিনিধি সভার (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ) আসনের মধ্যে ১৮২টিতে জয়লাভ করে। তবে একটি নতুন সুর যে শেষ পর্যন্ত কেবল শোরগোলে পরিণত হতে পারে– সেই আশঙ্কা এখন ক্রমেই বাস্তব মনে হচ্ছে।

নেপালি মধ্যবিত্তের জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও শক্তির প্রশ্নটি সর্বদা মাথার ওপর খাঁড়ার মতো ঝুলে থাকা সংকট হয়েই রয়েছে। মধ্যবিত্ত ভাবনার একটি মূর্ত রূপ হলেও দলটি কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা মধ্যবিত্তের হাহাকার শুনতে প্রস্তুত নয়। যেমন যাতায়াত খরচ বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান বাড়ি ভাড়া, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম, রান্নার গ্যাসের জন্য মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষা যার কয়েকটি মাত্র উদাহরণ। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের এসব লক্ষণ কেবল বাহ্যিক ধাক্কার ওপর চাপিয়ে দিলে তা মধ্যবিত্তের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়, যা দলের প্রতি ঘোর অবিশ্বাস ডেকে আনে।

অবিশ্বাসের এই চক্রটি এখন বেশ জটিল বলেই মনে হয়। বিনিয়োগকারীরা তাদের আস্থা ফিরে পাচ্ছেন না; অন্যদিকে ভোক্তারা এখন খরচ করতে ভয় পাচ্ছেন। পুঁজিবাদের জনক অ্যাডাম স্মিথ বলেছিলেন, ‘অদৃশ্য হাত’ই বাজারকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু নেপালের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই অদৃশ্য হাতও যেন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এদিকে, আরএসপির দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা দলের ভেতরে বা বাইরে– রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রতিটি পদক্ষেপকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন। এসব ঘটনা শুধু আরএসপির মূল কর্মীদেরই বিভ্রান্ত করছে না, তাদের ভোটারদেরও হতবাক করছে।

আরএসপির ১০০ দিনের পরিকল্পনা, যাকে জরুরি সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল এবং শুরুতে সাধারণ মানুষ এই রূপরেখা সানন্দে গ্রহণ করেছিল, তা এখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘কেন, কীভাবে, কাদের’ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ফিকে হয়ে গেছে। কে লাভবান হচ্ছে, কাকে সচেতনভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে; সবচেয়ে বড় কথা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার? প্রযুক্তিতন্ত্র বা টেকনোক্রেসি যদিও গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থি নয়, কিন্তু রাজনৈতিক আলোচনার বিকল্প হিসেবে যখন কারিগরি দক্ষতাকে বসানো হয়, তখন তা বাধার সৃষ্টি করে। আরএসপির টেকনোক্রেটিক মোহ তাদের ভাবমূর্তির জন্য উল্টো ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তারা নিজেদের কারিগরি সঠিকতাকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা হিসেবে তুলে ধরছে, যা বণ্টন, অগ্রাধিকার, স্বীকৃতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো মূল এজেন্ডাগুলো এক পাশে সরিয়ে রাখছে।

সাধারণ মানুষ আরএসপির এস্টাবলিশমেন্ট-বিরোধী ফাঁপা বুলিতে ক্রমেই মোহভঙ্গের বেদনা অনুভব করছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি কেবল জনগণের অবিশ্বাসের পাল্লাই ভারী করছে না; বরং জনতুষ্টিবাদী প্রতিশ্রুতির এই ব্যর্থতা আরএসপির উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘আইভি লিগ নেতাদের’ ভবিষ্যৎ ভেস্তে দিতে পারে এবং এমন এক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, যা নিয়ে আমরা নেপালিরা এখন ক্লান্ত।

আজকের তরুণ নেপালিরা আগের চেয়ে অনেক দ্রুত পুরোনো ধারণা ভুলতে শিখছে। তারা আরও বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সমতা, অন্তর্ভুক্তি, নৈতিক শাসন এবং ন্যায্য অংশগ্রহণ দেখতে চায়। তাই কেবল ‘সুশাসন’-এর দোহাই দিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ, আর্থিক স্বায়ত্তশাসন, ধর্মনিরপেক্ষতা, লিঙ্গ সমতা, বৈষম্য, সামাজিক অসংগঠিত খাত, বণ্টন, জাত প্রথা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো ঝুলন্ত ইস্যুগুলো ধামাচাপা দেওয়া যাবে না। আরএসপির স্বপ্ন আর আকর্ষণীয় নেই। কিন্তু এই অমীমাংসিত ইস্যুগুলো জনমানস থেকে সহজে মুছে যাবে না– দেয়ালের লিখন উপেক্ষা করার কোনো সুযোগই দলটির সামনে নেই।

বিকাশ ভট্ট ছেত্রী: স্বাধীন গবেষক এবং ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অতিথি শিক্ষক

আরও পড়ুন

×