ইসলাম ও সমাজ
মানবতার মুক্তির দিশারি
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানবতার মুক্তির দিশারি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনীর ওপর আলোচনা হলো সিরাতুন্নবী (সা.)। মানবেতিহাসে এমন কোনো চরিত্র নেই, যার জীবন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র– সব ক্ষেত্রে একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। আরবিতে তাঁর জীবনীকে বলা হয় ‘সিরাতুন্নবী’। সুতরাং সিরাতুন্নবী মানে নবীজির দেখানো পথ।
৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে, আরবি বর্ষ অনুযায়ী ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার প্রত্যুষে মক্কার কুরাইশ বংশে মা আমেনার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। জন্মের ছয় মাস আগেই তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। ৬ বছর বয়সে মা আমেনাকে হারান। ৮ বছর বয়সে দাদা আব্দুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করেন। এরপর চাচা আবু তালিবের স্নেহে বড় হতে থাকেন। রাখাল জীবন, এরপর ব্যবসা। সততা ও আমানতদারির কারণে আল-আমিন ও আস-সাদিক উপাধি পান।
৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন জীবন। সেখানে হজরত জিব্রাইল (আ.) মহান আল্লাহর নির্দেশে প্রথম ওহি নিয়ে এলেন: ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক’। অর্থাৎ পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। শুরু হলো নবুয়তি জীবন।
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহান আল্লাহর নির্দেশে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত। এখানে মহানবী (সা.) শুধু ধর্মপ্রচারক নন, বরং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। মদিনার মুহাজির-আনসার, ইহুদি, খ্রিষ্টান– সবাইকে নিয়ে রচনা করলেন মদিনা সনদ, যা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান। এই সনদের মূলকথা: ধর্মীয় স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক নিরাপত্তা ও সহাবস্থান। যুদ্ধ হলেও নারী, শিশু, বৃদ্ধ, উপাসনালয়ে আঘাত নিষিদ্ধ করলেন। বদর, উহুদ, খন্দক– প্রতিটি যুদ্ধে তিনি ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক এবং শেষে শান্তির প্রস্তাবকারী। হুদাইবিয়ার সন্ধি তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
পারিবারিক ও সামাজিক জীবন– নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।
তিনি নিজে ঘর ঝাড়ু দিতেন, কাপড় সেলাই করতেন, স্ত্রীদের কাজে সাহায্য করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, তিনি ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকতেন, আজানের সময় নামাজে চলে যেতেন। ব্যবসায় তিনি ঠকাননি; ওজনে কম দেননি। সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন; সুদ হারাম করেন; নারীকে মর্যাদা দেন; কন্যাসন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার জঘন্য প্রথা বন্ধ করেন।
মহানবী (সা.) ১০ম হিজরিতে এক লাখ ২৪ হাজার সাহাবির সামনে আরাফার ময়দানে দিলেন বিদায় হজের ভাষণ। এটা ছিল মানবাধিকারের ম্যাগনাকার্টা। তিনি বললেন: আজ থেকে সুদ বাতিল। রক্তের প্রতিশোধ বাতিল। নারীদের ওপর তোমাদের অধিকার আছে, তাদের ওপর তোমাদের অধিকার আছে।
মহানবী (সা.)-এর সিরাত থেকে আমাদের শিক্ষা :
১. নৈতিকতার সংকট, দুর্নীতি, মিথ্যা, প্রতারণা যখন স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে; নবীজির (সা.) আল-আমিন বা সত্যবাদী উপাধি লাভ আমাদের সততা ও আমানতদারির পাঠ দেয়।
২. সামাজিক অস্থিরতায় গোত্র, দল, ধর্ম ও বর্ণ, ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো নিয়ে বিভক্তি। মদিনা সনদ শেখায় কীভাবে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে হয়।
৩. পারিবারিক দ্বন্দ্ব: স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, সন্তান লালন-পালন, বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবা– প্রতিটি ক্ষেত্রে নবীজির (সা.) ঘরের উদাহরণ আমাদের জন্য অনুসরণীয়।
৪. নেতৃত্ব প্রদান: ক্ষমতা পেয়ে তিনি অহংকার করেননি। নিজে খেজুরের চাটাইয়ে ঘুমিয়েছেন। রাষ্ট্র চালিয়েছেন ইনসাফ দিয়ে। স্বচ্ছতা, সততা, আমানতদারি ও ন্যায়নিষ্ঠা ছিল তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার মূলমন্ত্র, যা বর্তমান সময়ে খুবই প্রয়োজন।
আজ যদি আমরা ব্যবসায় আল-আমিন হই; পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়ের প্রতীক হই, তবে ব্যক্তি ও জাতি হিসেবে আমরাও সফল হবো, ইনশাআল্লাহ।
তাই আসুন, আমরা সিরাতুন্নবীর (সা.) আলোয় নিজেদের জীবনকে আলোকিত করি।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার