মিলাদুন্নবী (সা.)
শান্তি, ন্যায় ও মানবতার পথপ্রদর্শক
মো. শাহাদাত হোসেন
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমন কোনো একটি জাতি, ভূখণ্ড, যুগ কিংবা সম্প্রদায়ের জন্য সীমাবদ্ধ কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। এটি সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক অনন্ত রহমতের দ্বার উন্মোচন। পবিত্র কোরআনের ভাষায়– ‘আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আল-আম্বিয়া: ১০৭) তিনি এসেছিলেন মানুষকে শুধু নামাজ শেখাতে নয়; মানুষ হতে শেখাতে। শুধু মসজিদ নির্মাণ করতে নয়; মানবিক সমাজ নির্মাণ করতে।
শুধু পরকালের মুক্তির পথ দেখাতে নয়; দুনিয়াতেও ন্যায়, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও শান্তির ভিত্তি স্থাপন করতে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনকে যদি কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে তাঁর মহান জীবনাদর্শের বিশালতাকেই সংকুচিত করা হয়। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে ইবাদতের শিক্ষক, আত্মশুদ্ধির পথপ্রদর্শক, পরিবারের আদর্শ অভিভাবক, সমাজ সংস্কারক, ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠাতা, রাষ্ট্রনায়ক, কূটনীতিক, অর্থনৈতিক নীতির পথপ্রদর্শক এবং যুদ্ধ ও শান্তির নৈতিক নীতির শিক্ষক। তাঁর জীবন ব্যক্তিমানুষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক কাঠামো প্রদান করে। ব্যক্তির জন্য তিনি দিয়েছেন তাকওয়া, আত্মসংযম, সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা।
পরিবারের জন্য দিয়েছেন ভালোবাসা, দায়িত্ব, পারস্পরিক সম্মান ও দয়ার শিক্ষা। সমাজের জন্য দিয়েছেন ন্যায়, ভ্রাতৃত্ব, প্রতিবেশীর অধিকার ও দুর্বল মানুষের মর্যাদা। অর্থনীতির জন্য দিয়েছেন হালাল উপার্জন, ন্যায়সংগত বাণিজ্য, প্রতারণা ও শোষণবিরোধী নীতি এবং সম্পদের সামাজিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রের জন্য দিয়েছেন আমানত, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণের আদর্শ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি দিয়েছেন অঙ্গীকার রক্ষা, শান্তির প্রতি অগ্রাধিকার, দূতদের মর্যাদা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানের শিক্ষা। যুদ্ধের ক্ষেত্রেও তিনি সীমাহীন প্রতিশোধের পরিবর্তে নীতি, সংযম ও মানবিকতার সীমারেখা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এ কারণেই তাঁর সুন্নাহ কেবল অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি ভবিষ্যৎ মানবসভ্যতার জন্যও একটি জীবন্ত নৈতিক কম্পাস। মদিনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) যে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ক্ষমতা দখলের প্রকল্প নয়; ছিল মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রকল্প। তিনি এমন একটি সমাজ নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে মুহাজির ও আনসার ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন; বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক সহাবস্থানের কাঠামো গড়ে উঠেছিল; বিচারব্যবস্থায় ধনী-গরিবের জন্য পৃথক নীতি ছিল না।
আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্রক্ষমতা যখন অনেক সময় ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থ কিংবা গোষ্ঠীগত আধিপত্যের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাষ্ট্রচিন্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়– শাসন একটি আমানত, আর জনগণ সেই আমানতের অধিকারী।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাজনীতিতে মিথ্যা ছিল না, প্রতারণা ছিল না, অঙ্গীকার ভঙ্গ ছিল না। শত্রুর সঙ্গেও তিনি নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করেননি। তাঁর রাজনীতি ছিল ক্ষমতার জন্য মানুষকে ব্যবহার করার রাজনীতি নয়; বরং মানুষকে মর্যাদা দেওয়ার রাজনীতি। তাই একজন মুসলিম রাজনীতিবিদের জন্য নবীজির সুন্নাহর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে। সত্যকে দলের চেয়ে বড় করা, ন্যায়কে ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে বড় করা এবং জনগণের কল্যাণকে ক্ষমতার চেয়ে বড় করা।
যে রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে দেখা হয় না; যে রাজনীতিতে মিথ্যা প্রচারকে কৌশল বলা হয়; যে রাজনীতিতে দুর্নীতিকে ক্ষমতার স্বাভাবিক মূল্য হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, সে রাজনীতি যতই ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করুক; রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাজনৈতিক নৈতিকতার সঙ্গে তার মৌলিক দূরত্ব থেকেই যায়।
আজকের পৃথিবীর চরম বৈষম্য, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক শোষণ ও সীমাহীন ভোগবাদ আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে– উন্নয়ন কি কেবল জিডিপির পরিমাপ, নাকি মানুষের মর্যাদা ও কল্যাণও উন্নয়নের অপরিহার্য সূচক?
প্রথম ওহির প্রথম শব্দ: ‘ইকরা’– পড়ো। এটি কেবল বই পড়ার নির্দেশ নয়। এটি জ্ঞান, চিন্তা, উপলব্ধি ও সত্য অনুসন্ধানের সভ্যতার আহ্বান। কিন্তু নবীজির শিক্ষা জ্ঞানকে চরিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। কারণ জ্ঞান যদি নৈতিকতা হারায়, তবে তা মানুষের মুক্তির বদলে মানুষের ধ্বংসের অস্ত্রও হতে পারে। তাই নবীজির শিক্ষা-দর্শনের লক্ষ্য ছিল এমন মানুষ তৈরি করা, যার মস্তিষ্ক জ্ঞানে সমৃদ্ধ এবং হৃদয় তাকওয়ায় আলোকিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবন আমাদের শেখায়– একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার অস্ত্রভান্ডারে নয়; বরং তার নৈতিক সংযমে।
মো. শাহাদাত হোসেন: পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার