ইসলাম ও সমাজ
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। যে ব্যক্তি দৈহিকভাবে পবিত্র থাকে না, তার মনও তাতে প্রভাবিত হয়। যে কারণে নামাজ আদায়ের জন্য অজু করতে হয়। নাপাক অবস্থা থেকে পাক হওয়ার জন্য মল-মূত্র
ত্যাগের পর সঠিকভাবে পরিচ্ছন্ন হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানও স্বীকার করেছে, যে মানুষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে; মানসিক দিক থেকেও সে অধিকতর সুস্থ থাকে।
এমনকি শারীরিক সুস্থতার জন্যও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিকল্প নেই। একবার রাসুল (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, ‘এ কবরবাসীদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, অথচ তাদের কোনো বড় কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। তাদের একজন চোগলখোরি করত, অপর ব্যক্তি প্রস্রাব থেকে পুরোপুরি পবিত্র হতো না।’
তিনি বলেন, ‘তোমরা প্রস্রাব থেকে পাক-পবিত্র থাকো।’
ইসলাম ব্যক্তির শরীরকে আমানত মনে করে। এর হেফাজত করা ফরজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ফিতরাতের ১০টি কাজের কথা বলেছেন: গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা, বগল ও নাভির নিচের লোম পরিষ্কার, মেসওয়াক, নাক-মুখে পানি দেওয়া ইত্যাদি। (মুসলিম)।
দিনে পাঁচবার হাত-মুখ-নাক-পা ধুয়ে অজু করা ফরজ। করোনা মহামারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার হাত ধোয়ার জন্য বলেছে। ইসলাম তা ১৪৫০ বছর আগেই ফরজ করেছে। অজু শুধু পবিত্রতা দেয় না; ত্বকের রোগ ও ভাইরাস থেকেও রক্ষা করে।
জুমা ও ঈদের দিন গোসল তাগিদপূর্ণ সুন্নত। সপ্তাহে অন্তত একবার পুরো শরীর পরিষ্কার করার অভ্যাস ইসলাম গড়ে দেয়।
নামাজের জন্য পবিত্র পোশাক শর্ত। এক ফোঁটা প্রস্রাব লাগলেও তা না ধোয়া পর্যন্ত নামাজ হবে না। এ শিক্ষা আমাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে সচেতন করে।
হাদিস শরিফে বর্ণিত, তোমরা তোমাদের আঙিনা পরিষ্কার রাখো এবং ইহুদিদের মতো হইও না। (তিরমিজি)। অর্থাৎ ঘরবাড়ি, উঠান, টয়লেট পরিষ্কার রাখা ইমানের দাবি। যে ঘরে পরিচ্ছন্নতা নেই, সে ঘরে বরকত ও রহমতের ফেরেশতা আসে না (মুসলিম)।
ইসলাম ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, সমাজকেন্দ্রিক। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া ইমানের একটি শাখা। (বুখারি)। একটি ইট, কলার খোসা বা পেরেক সরিয়ে দিলেও সওয়াব। অথচ আজ আমরা রাস্তায় প্লাস্টিক, থুতু ফেলে ইমান থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। পানির উৎস দূষণ কঠোরভাবে নিষেধ। তিনি স্থির পানিতে প্রস্রাব করতে ও থুতু ফেলতে নিষেধ করেছেন। গাছের নিচ, ছায়া ও মানুষের চলাচলের পথে মলত্যাগ নিষেধ (মুসলিম)। এটি পরিবেশ আইনের মূলনীতি।
খাওয়ার আগে হাত ধোয়া, খাবার ঢেকে রাখা, বাসি-পচা খাবার না খাওয়া। পানির পাত্রে ফুঁ দিতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, এতে জীবাণু ছড়ায়। পানির অপচয়ও নিষেধ। নদীর তীরে থাকলেও অজুতে অপচয় করা যাবে না (ইবনে মাজাহ)।
ইসলাম কেবল বাহ্যিক ময়লা নয়, অন্তরের ময়লাও দূর করতে বলে। গিবত, মিথ্যা, হিংসা, বিদ্বেষ সমাজের ক্যান্সারের মতো। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, প্রকৃত মুসলমান সে, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে (বুখারি)।
একটি জাতির উন্নতি নির্ভর করে তার স্বাস্থ্যের ওপর। আর স্বাস্থ্য নির্ভর করে পরিচ্ছন্নতার ওপর।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ডায়রিয়ার মূল কারণ পানি জমা ও ময়লা।
ইসলামের শিক্ষা যদি মানা হয়, তাহলে প্রতিটি মসজিদের অজুখানা ও টয়লেট পরিষ্কার থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা নখ-চুল-পোশাকের ব্যাপারে সচেতন হবে। বাজার ও রাস্তায় ময়লা ফেলা কমবে। হাসপাতালের চাপ অর্ধেক কমে যাবে। সরকার ‘পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ ক্যাম্পেইন চালায়। ইসলাম তা ১৪৫০ বছর আগেই ইমানের শাখা ঘোষণা করেছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ দিয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা গেলে এই ক্যাম্পেইন ফলপ্রসূ হবে।
রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবন ছিল পরিচ্ছন্নতার সর্বোত্তম উদাহরণ। তিনি বলেন, আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন (মুসলিম)। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র– সবখানে পরিচ্ছন্নতার চর্চা দরকার। কারণ, পরিচ্ছন্ন ঘরেই আল্লাহর রহমত আসে। পরিচ্ছন্ন সমাজেই জাতির উন্নতি হয়।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম প্রচার