রাইট টার্ন
বিদেশি বিনিয়োগকারী কেন বাংলাদেশে আসবেন?
মোহাম্মদ গোলাম নবী
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে বিনিয়োগ সহজ করতে সরকার, গত ২০ আগস্ট, ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬ কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ) একীভূত করে গঠিত ইনভেস্ট বাংলাদেশ গত ২৩ আগস্ট নতুন পরিচয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের শীর্ষ বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে কাজ করবে।
উদ্দেশ্যটি নিশ্চয়ই ভালো। কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠানটির যাত্রার শুরুতেই কয়েকটি প্রশ্ন করা দরকার। প্রথম প্রশ্নটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে নয়, ফলাফল নিয়ে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। পরে বিডা, বেজা, পিপিপিএ এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা মিডা–এই চার প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বই তাঁর হাতে আসে। এমনকি চলতি বছরের মার্চে তাঁর নেতৃত্বেই চার প্রতিষ্ঠানের যৌথ ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার আনা। প্রশ্ন আসে, এক নেতৃত্বে থাকায় সমন্বয়ের সুযোগ তো আগেও ছিল। নতুন প্রতিষ্ঠান করায় এমন কী পরিবর্তন ঘটবে, যা আগের কাঠামোয় সম্ভব ছিল না?
প্রশ্নটি আশিক চৌধুরীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা নিয়ে নয়। এটি জবাবদিহির প্রশ্ন।
তাঁর দায়িত্বকালে বিনিয়োগ সম্মেলন হয়েছে, বিদেশে বিনিয়োগ প্রচারণা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগের ঘোষণাও এসেছে। ২০২৫ সালের বিনিয়োগ সম্মেলনের পর প্রায় তিন হাজার ১০০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রস্তাবের কথাও জানানো হয়েছিল। কিন্তু বিনিয়োগ প্রস্তাব আর বাস্তব বিনিয়োগ এক জিনিস নয়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৭৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। সংখ্যাটি ইতিবাচক। কিন্তু নতুন শেয়ার মূলধন বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। নিট এফডিআই বৃদ্ধিতে পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা ও আন্তঃকোম্পানি ঋণের বড় ভূমিকা ছিল। অর্থাৎ বিনিয়োগ নিয়ে অনেক উদ্যোগ ও আশ্বাসের পরও নতুন বিদেশি মূলধনের বড় প্রবাহ বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে, এখনও এমন দাবি করা যায় না।
এ কারণেই নতুন প্রতিষ্ঠানের যাত্রার শুরুতে আগের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন প্রয়োজন। একটা সমস্যা ঘিরে বাংলাদেশে নতুন নামে প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ কম হয়নি। আশার কথাও কম শোনা হয়নি। সমস্যাটি থেকে গেছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যেন কয়েক বছর পর একই কথা বলতে না হয়।
এখানে পিপিপি কর্তৃপক্ষকে একীভূত করার সিদ্ধান্তটিও ব্যাখ্যা দাবি করে। বিডা ও বেজার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু পিপিপি শুধু বিনিয়োগ প্রচার বা বিনিয়োগকারীদের সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান ছিল না। সরকারি অবকাঠামো ও জনসেবা প্রকল্পে বেসরকারি খাতকে অংশীদার করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য এর স্বতন্ত্র আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে, সমন্বিত সেবা দেওয়ার জন্য এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটিকেও বিলুপ্ত করা কেন প্রয়োজন হলো? একীভূত হওয়ার ফলে তার বিশেষায়িত সক্ষমতা শক্তিশালী হবে, নাকি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকবে–সে প্রশ্নও করা যায়।
সর্বোপরি, একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে কেন আসবেন? তিনি হিসাব করবেন কোথায় ব্যবসা বেশি প্রতিযোগিতামূলক হবে, বিনিয়োগ নিরাপদ থাকবে এবং আগামী ১০ বা ২০ বছর ব্যবসার পরিবেশ কতটা অনুমানযোগ্য থাকবে। সহজে জমি পাওয়ার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ তার দরকার। কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানির সময়, বন্দরের সক্ষমতা, পরিবহন খরচ, করনীতির স্থিতিশীলতা, দক্ষ কর্মী ও বৈদেশিক মুদ্রার সহজলভ্যতা তিনি হিসাবে আনবেন। মুনাফা নিতে পারবেন কিনা, বাণিজ্যিক বিরোধ কত দ্রুত নিষ্পত্তি হবে, ইত্যাদিও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মোটকথা, একজন বিনিয়োগকারী একটি বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ নয়, দেশের পুরো ব্যবস্থার ওপর বিনিয়োগ করেন। অন্যদিকে, তাঁর সামনে ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াসহ বহু বিকল্প রয়েছে।
এক জায়গা থেকে সেবা অবশ্যই দরকার। প্রথম দরজাটি সহজ করে ভেতরে বিদ্যুৎ, গ্যাস, কাস্টমস, বন্দর, অর্থায়ন, কর ও নীতির অনিশ্চয়তা রেখে দিলে বিনিয়োগ আসবে না। নিঃসন্দেহে, আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার, বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাকশিল্পে আমরা প্রমাণ করেছি, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে বড় উৎপাদন কেন্দ্র হতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনা নিজে থেকে বিনিয়োগে পরিণত হয় না।
আমার প্রস্তাব, নতুন প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর একটি ‘কেন বিনিয়োগ এলো না’ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে। কতজন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, কতজন বাস্তবে বিনিয়োগ করেছেন, কতজন সরে গেছেন এবং তার কারণ সেই প্রতিবেদনে থাকতে পারে।
আশিক চৌধুরী এক বছরের জন্য নতুন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হয়েছেন। এক বছর পর ওইসব সূচক দিয়েই তাঁর মূল্যায়ন করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা সংস্কারের শুরু হতে পারে, কিন্তু তা-ই সংস্কার নয়। সরকার ইনভেস্ট বাংলাদেশ তৈরি করে বিনিয়োগকারীর জন্য একটি নতুন দরজা তৈরি করেছে। এখন আমাদের জানতে হবে, দরজার ওপাশে কী বদলেছে, যা দেখে একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী তাঁর অর্থ নিয়ে বাংলাদেশে আসবেন?
এই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর তৈরি করা ইনভেস্ট বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ জন্য তাকে সময় দেওয়া যায়। তবে সময়ের সঙ্গে লক্ষ্য, ফলাফল ও জবাবদিহিও থাকতে হবে; যাতে এক বছর পর আমরা আশ্বাস নয়, বাস্তব ফল নিয়ে কথা বলতে পারি।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
- বিষয় :
- মোহাম্মদ গোলাম নবী