সাম্প্রতিক
নেপালে দুর্যোগের মধ্যেও গোর্খাদের নিয়ে নাটক
মামুনুর রশীদ
মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৮ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ১১:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি নাটকের কাজে নেপাল এসেছি। কোনো চলচ্চিত্র বা টিভি নাটকের জন্য নয়। একটি মঞ্চ নাটকের জন্য। নাটকটি হবে নেপালি ভাষায়; লিখেছেন একজন হংকংবাসী চীনা নাগরিক, যার নাম মক চিউ-ইউ। তিনি লিখেছেন ইংরেজিতে। ইংরেজি থেকে নেপালি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। লেখক আমার পুরোনো বন্ধু। ১৯৮৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি কর্মশালায় পরিচয়। সেই থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নাটকের কর্মকাণ্ডে একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেছি। আমাদের দেশেও বহুবার এসেছেন তিনি। এককালে আমরা এশিয়ান পিপলস থিয়েটার গড়ে তুলেছিলাম।
বহু বছর ধরে সেই চীনা বন্ধুর মাথায় একটি পরিকল্পনা ঘুরছে। তা হলো গোর্খা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে একটি মঞ্চ নাটক নির্মাণ করা। তাঁর ভাবনায় খুব শক্তভাবেই ঢুকে গেছে একটি ধারণা– গোর্খা জনগোষ্ঠী দরিদ্র হলেও সাহসী। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাদের বহু যুগ ধরে ব্যবহার করে আসছে। প্রথম মহাযুদ্ধ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, মালয়ে জরুরি ব্যবস্থায় এদের ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ শেষের পাওনা যতটুকু মিলবার, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ততটুকু মেলেনি। তাদের কেউ কেউ ইংল্যান্ড বা হংকংয়ে থেকে যান। অনেকে নেপালে ফিরে এসে শেষ জীবন কাটান।
এর মধ্যেই নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন মক চিউ-ইউ। দুরূহ কাজ। ইংরেজি ও নেপালি কোনোটাই আমার মাতৃভাষা নয়। অনেক কষ্ট করে বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করতে হয়। কারণ নির্দেশকের দায়িত্ব আমার। নেপালি, চীনা ও ব্রিটিশদের সঙ্গেই কাজ।
বলে রাখা দরকার, নেপালিদের মধ্যে গোর্খারাও স্বতন্ত্র। তারা আদিবাসী। তাদের সংস্কৃতি ভিন্ন। অত্যন্ত সরল, সহজ ও সাহসী। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয়ী হওয়ার পেছনে তাদের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বার্মায় জাপানিদের বিরুদ্ধেও তারা প্রাণপণে লড়েছে। এসব নিয়েই নাটক।
মহড়া চলছে সারাদিন। এর মধ্যে একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে গেল। কেউ বলছেন হড়পা বান, যা মূলত আকস্মিক ঢল। তবে এ অবিশ্বাস্য এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা সারাবিশ্বকে নাড়া দিয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা হিমালয়ের অনেক উঁচুতে হিমবাহ বিপর্যয়কে প্রাথমিক কারণ মনে করছেন। ২৬ আগস্ট সকাল ১০টায় দীর্ঘ নদী তিরমুলিতে জলোচ্ছ্বাস শুরু হয়, যে নদীর উৎস চীনে। নদীটির কিছু স্থানে নাব্য ছিল, কোথাও আবার প্রায় শুষ্ক। হঠাৎ জলোচ্ছ্বাসে নদী শুধু ভরেই ওঠেনি; প্রবল বেগের কারণে আশপাশের আবাসিক ভবন, হোটেল, সরকারি দপ্তর, বাজারঘাট, স্কুল-কলেজ সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২০০ লোক নিহত হয়েছে বলা হলেও তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এবং ছয় থেকে সাত হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। হতাহত ও নিখোঁজদের মধ্যে ইউরোপ, আমেরিকা, ভারতসহ বহু দেশের পর্যটক যেমন রয়েছেন, তেমনি আছেন স্থানীয়রাও। উদ্ধারকাজ চলছে। ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী স্থানটি রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরত্বে। আমরা বিকেলের আগে বিষয়টি বুঝতেই পারিনি। মানুষের তেমন আহাজারিও দেখা যায়নি। নেপাল অবশ্য একই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ অতীতে দেখেছে। বেশি দিন আগের কথা নয়; একটা ভূমিকম্পে ৯ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল সেখানে এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত। তবে উদ্ধারকাজটা কেমন হয় সেদিকে সবাই নজর দেয়; জনগণও ঝাঁপিয়ে পড়ে।

কাঠমান্ডুতে আমাদের আরও কিছুদিন থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কী দাঁড়ায় এবং রাষ্ট্র বিষয়টি কীভাবে দেখবে, তাও দেখার বিষয়।
নেপালের মানুষ খুবই সংগীতপ্রিয়, যদিও নাটকে তাদের অংশগ্রহণের বিষয় খুব প্রাচীন নয়। ১৯৮৫ সাল থেকে আগ্রহের সূচনা। পথনাটক তখন বেশ জনপ্রিয়। নব্বইয়ের পর থেকে নাট্যদল গড়ে উঠতে থাকে। এই অল্প সময়ের মধ্যে ৯-১০টি বেসরকারি থিয়েটার গড়ে উঠেছে, যেখানে নিয়মিত নাট্যাভিনয় হয়ে থাকে। দর্শক সংখ্যা সেখানে সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ থাকে। যখন নতুন নাটক নামে, তার মঞ্চায়ন হয় এক মাসব্যাপী।
আনন্দের বিষয়, লেখক, নির্দেশক, যন্ত্রী, অভিনেতা-অভিনেত্রী সবাই সম্মানী পেয়ে থাকেন নেপালে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, নাটক এখানে চলচ্চিত্র থেকে বেশি জনপ্রিয়। আমাদের দেশে কখনও কখনও আমরা এমন ছোট থিয়েটার গড়ার চেষ্টা করেছি, এখনও চেষ্টা চলছে। কিন্তু একেবারেই পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে শিল্পকলা বা সরকারি মঞ্চের ওপর নির্ভরতা না কমালে কখনোই এই শিল্প জনপ্রিয় হবে না। এই সত্য দ্রুত উপলব্ধি প্রয়োজন। নেপালেও নাটক সরকারের পক্ষ থেকে খুব বেশি পৃষ্ঠপোষকতা পায় না। কিন্তু এই যে থিয়েটারের জন্য আলাদা জায়গা দরকার, এই উপলব্ধি বহু আগেই তাদের হয়েছে। এত বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও জীবনের কোথাও কোনো সংকট হয়নি। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ অনেক বেশি আবেগপ্রবণ। তাই সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায় অথবা এমন একটা হুলস্থূল লেগে যায়, উদ্ধারকর্মীরা ঠিকমতো কাজই করতে পারেন না।
গোর্খাদের নিয়ে নাটকের কী পরিণতি হবে, জানি না। তবে পৃথিবীর কোথাও একটা জাতিসত্তা বঞ্চিত হচ্ছে; তাদের এ বঞ্চনার বিষয়কে যদি কোনো নাট্যকর্মী নাটকের মাধ্যমে আলোচনার বিষয় করতে চান, তাকে চিন্তার মহত্ত্ব বলে ভাবতেও পারি আমরা।
মামুনুর রশীদ: নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
- বিষয় :
- মামুনুর রশীদ