ঢাকা শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরিবেশ-প্রতিবেশ

নদী যদি মরে যায়, আমরাও বাঁচব কতদিন?

নদী যদি মরে যায়, আমরাও বাঁচব কতদিন?
×

ফাইল ছবি

জিয়া আহমেদ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৩২

ঢাকার চারপাশে একসময় চারটি নদী মালার মতো জড়িয়ে ছিল– বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু আর শীতলক্ষ্যা। নৌকা চলত, মাছ ধরা পড়ত, শিশুরা সাঁতার কাটত। আজ সেই নদীগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটলে নাক চেপে ধরতে হয়। পানির রং কালচে, ভাসছে প্লাস্টিক আর রাসায়নিক ফেনা। সাভার-আমিনবাজার-হেমায়েতপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী কিংবা হবিগঞ্জ– যেখানেই শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে, তার পাশের নদীটির ভাগ্য প্রায় একই রকম। এই লেখার উদ্দেশ্য ভয় দেখানো নয়; বরং প্রতিষ্ঠিত গবেষণা ও সরকারি-আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের আলোকে বোঝা, নদীকে অবহেলা করলে আমরা ঠিক কী কী হারাচ্ছি।

দূষণের চিত্র
বুড়িগঙ্গা নিয়ে সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, নদীর দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা নেমে এসেছে লিটারপ্রতি মাত্র ১.৭০ থেকে ২.৬৮ মিলিগ্রামে, অথচ সুস্থ নদীর জন্য প্রয়োজন অন্তত ৫ মিলিগ্রাম। ওই একই জরিপে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ মিলিয়ে ২২৪টি দূষণ-উৎস চিহ্নিত হয়েছে; যার প্রধান উৎস ট্যানারি বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য ও কলকারখানার রাসায়নিক নির্গমন। গবেষকদের হিসাবে, দেশের টেক্সটাইল শিল্প বছরে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ টন বর্জ্য ও ৫ লাখ টন স্লাজ উৎপন্ন করে; যার বড় অংশ সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে।
সাভার-আমিনবাজার-হেমায়েতপুরের চিত্রও ভিন্ন নয়। হাজারীবাগ থেকে পরিবেশদূষণ কমাতে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করা হয়েছিল হেমায়েতপুরে, কিন্তু সেখানকার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় চলে না। দৈনিক শোধন ক্ষমতা মাত্র ২৫ হাজার ঘনমিটার, অথচ ট্যানারিগুলো উৎপন্ন করে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনমিটার আধা-শোধিত বা অশোধিত বর্জ্য গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরী নদীতে; যে নদী একসময় স্বচ্ছ ছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
গাজীপুর হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত প্রবাহিত শীতলক্ষ্যার অবস্থাও উদ্বেগজনক। পরিবেশবাদীদের হিসাবে নারায়ণগঞ্জে প্রায় সাড়ে ৪০০ ডাইং কারখানা রয়েছে, যাদের বেশির ভাগেরই বর্জ্য শোধনাগার থাকলেও তা নিয়মিত চালানো হয় না; রাতের অন্ধকারে সরাসরি রাসায়নিক বর্জ্য ছেড়ে দেওয়া হয় নদীতে। এই নদী গাজীপুর ও নরসিংদী জেলা হয়ে প্রবাহিত হয়ে নারায়ণগঞ্জে ধলেশ্বরীর সঙ্গে মিশেছে। ফলে একটি জেলার দূষণ ছড়িয়ে পড়ে পুরো অববাহিকায়।
হবিগঞ্জে চিত্র আরও করুণ। সম্প্রতি জলকেলি ও পরিবেশবাদী সংগঠনের পরিদর্শনে দেখা গেছে, শিল্পকারখানার বর্জ্যে রাজখাল এমনভাবে দূষিত হয়েছে যে চারটি গ্রামে গবাদিপশু মারা গেছে ও ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। খোয়াই ও সুতাং নদীও একই সংকটে– কারখানার রাসায়নিক বর্জ্যে পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ায় স্থানীয় কৃষক ও জেলেরা জীবিকা হারাচ্ছেন।

প্রতিবেশগত গুরুত্ব: শুধু পানি নয়, একটি জীবন্ত ব্যবস্থা
নদী কোনো নিছক জলধারা নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ প্রতিবেশতন্ত্র। বাংলাদেশের মিঠাপানিতে একসময় প্রায় ২৬০-এর বেশি প্রজাতির দেশি মাছ ছিল। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের লাল তালিকা অনুযায়ী, এর মধ্যে ৬৪টি প্রজাতি বিপন্ন থেকে মহাবিপন্ন পর্যায়ে চলে গেছে। গত তিন-চার দশকে বেশ কিছু প্রজাতি বন্য পরিবেশ থেকে একেবারে হারিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অন্তর্দেশীয় ধরা– মাছের উৎপাদন ১৯৮৩-৮৪ সালের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ৬৩ শতাংশ থেকে নেমে ২০২২-২৩ সালে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশে। আরও উদ্বেগের বিষয়, ওই গবেষণায় ঢাকার নদীর জীববৈচিত্র্য-সূচক (শ্যানন-ওয়াইনার ইনডেক্স) পাওয়া গেছে প্রায় শূন্য অর্থাৎ কার্যত জীববৈচিত্র্য বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই।
বুড়িগঙ্গার মতো নদীতে একসময় দেখা মিলত বিপন্ন গাঙ্গেয় ডলফিনের। পানি দূষণ ও জলযান চলাচলের চাপে এই স্তন্যপায়ী প্রাণীর সংখ্যা ক্রমেই কমছে। মাছ, জলজ উদ্ভিদ আর অণুজীবের এই জটিল শৃঙ্খল ভেঙে পড়লে তার প্রভাব শুধু জেলে পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না– খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরের স্তরে থাকা মানুষও এর মূল্য দেয়, দূষিত মাছ খেয়ে বা মাছের আকাল দেখে।

নদী কীভাবে শহরকে শীতল রাখে
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, নদী শুধু পরিবহন বা মাছের উৎস নয়– এটি শহরের প্রাকৃতিক শীতাতপ ব্যবস্থাও। বিশ্বজুড়ে পরিচালিত একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, শহুরে নদী আশপাশের বাতাসের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে ও আর্দ্রতা বাড়ায়। জাপানের হিরোশিমার ওতা নদীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর ঠিক ওপরে তাপমাত্রা প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যায় আর এই শীতলকরণ প্রভাব নদীর তীর থেকে শত মিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। চীনের বিভিন্ন শহরে চালানো গবেষণাতেও একই প্রবণতা মিলেছে– জলাশয়ের আশপাশের এলাকা কয়েকশ মিটার পর্যন্ত তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে।
ঢাকার মতো ক্রমবর্ধমান তাপ-দ্বীপে পরিণত হওয়া শহরের জন্য এই প্রাকৃতিক শীতলকরণ ব্যবস্থা অমূল্য। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, তীব্র তাপের কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে, যার অর্থনৈতিক ক্ষতি ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার। নদী যখন সরু হয়ে যায়, দখল-ভরাটে হারিয়ে যায় বা কালচে বিষাক্ত জলে পরিণত হয়, তখন এই স্বাভাবিক শীতলকরণ ক্ষমতাও কমে যায় আর শহরের তাপ আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে।

পর্যটন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, যা আমরা হারাচ্ছি
একটি জীবন্ত নদী মানেই সম্ভাবনাময় পর্যটন-নদীতীরের রেস্তোরাঁ, নৌ-ভ্রমণ, স্থানীয় হস্তশিল্প ও মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি। বিশ্বের অনেক নদীতীরবর্তী শহর ব্যাংকক, আমস্টারডাম, সিউলের চংগেচন খাল– নদী পুনরুদ্ধার করে পর্যটন ও নাগরিক জীবনযাত্রার মান বাড়িয়েছে। অথচ বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যার দুর্গন্ধ ও কালো পানি দেখে কোনো পর্যটক নৌ-ভ্রমণে আগ্রহী হবেন না, স্থানীয় বাসিন্দারাও নদীমুখী হতে চান না।
অর্থনৈতিক হিসাবটাও ভয়াবহ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, ২০১৯ সালে শুধু পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে; যা মোট জিডিপির ১৭ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। এর আগে ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছিল, শুধু নগর এলাকার দূষণজনিত ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৬৫০ কোটি ডলার। সম্প্রতি অনুমোদিত মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স কর্মসূচির আওতায় বিশ্বব্যাংক ৩৭ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে শুধু গ্রেটার ঢাকার পানিদূষণ কমাতে ও নদী-খাল পুনরুদ্ধারে। কারণ এই অঞ্চল দেশের মোট আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রায় অর্ধেক আর জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জোগান দেয়। নদী বাঁচিয়ে রাখা তাই নিছক পরিবেশবাদী আবেগ নয়, এটি সরাসরি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

জীবিকা ও মানুষের গল্প
পরিসংখ্যানের আড়ালে থাকে মানুষের গল্প। শীতলক্ষ্যা পারের এক জেলে পরিবার তিন প্রজন্ম ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত; এখন মাছের আকালে তাদের পেশা বদলাতে হয়েছে। হবিগঞ্জের রাজখাল-তীরবর্তী কৃষকরা দূষিত পানিতে গবাদিপশু হারিয়ে এখন মানবিক সংকটে। এক সাম্প্রতিক গবেষণায় বুড়িগঙ্গার শ্যামপুর অংশে সত্তরের বেশি বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি মিলেছে; যা শুধু নদীর নয়, আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
শীতলক্ষ্যার পাড়ে এক পড়ন্ত বিকেলে দেখা হয়েছিল ষাটোর্ধ্ব মতিন মাঝির সঙ্গে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘চাচা, এখনও মাছ ধরেন এই নদীতে?’ তিনি একটু হাসলেন, তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাবা, এই নদী আমার মায়ের মতো। ছোটবেলায় এই পানিতে গোসল করে বড় হয়েছি, এই পানি খেয়েছি, এই নদীর মাছ বিক্রি করেই ছেলেমেয়ে মানুষ করেছি। এখন এই পানি গায়ে লাগলে চুলকানি হয়, ঘা হয়ে যায়। মা অসুস্থ হলে সন্তান কি তাঁকে ফেলে দেয়? আমিও পারি না। তাই রোজ সকালে আসি, নদীটাকে একবার দেখি, তারপর খালি হাতে ফিরে যাই।’
কথাগুলো বলে মতিন মাঝি চুপ করে গেলেন। তাঁর সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছিল কালচে পানি, আর দূরে একটা কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠছিল আকাশের দিকে। সেদিন মনে হয়েছিল– নদীর দূষণ আসলে শুধু পরিবেশের সংকট নয়, এ যেন এক ধরনের নীরব সন্তানহীনতা, মা হারানোর বেদনার মতোই কিছু, যা আমরা প্রতিদিন চোখের সামনে দেখেও সয়ে যাচ্ছি। মতিন মাঝির মতো লাখো মানুষের এই নীরব কষ্টটাই বোধহয় আমাদের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

এখন করণীয়
সমাধান জটিল নয়, প্রয়োজন কেবল বাস্তবায়নের সদিচ্ছা। প্রথমত, বিদ্যমান বর্জ্য শোধনাগারগুলো (ইটিপি-সিইটিপি) পূর্ণ সক্ষমতায় নিয়মিত চালানো নিশ্চিত করতে হবে, শুধু কাগজে-কলমে নয়। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি ও জরিমানা-কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও নিয়মিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মতো স্থানীয় নাগরিক উদ্যোগগুলোকে আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন দিতে হবে। চতুর্থত, বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে করতে হবে।
নদী আমাদের কাছে ঋণী নয়, বরং আমরাই নদীর কাছে ঋণী-পানীয় জল, মাছ, পরিবহন, শীতল বাতাস আর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য। বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ কিংবা খোয়াই-সুতাং-এই নদীগুলো যদি আজ আমরা বাঁচাতে না পারি, আগামী প্রজন্মের কাছে রেখে যাব শুধু মানচিত্রে আঁকা কিছু রেখা, যেখানে একদিন প্রাণ ছিল। সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। কারণ নদী মরে গেলে তার সঙ্গে মরে যায় একটি জনপদের ভবিষ্যৎও।

 ড. জিয়া আহমেদ: শিক্ষক ও গবেষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
[email protected]

আরও পড়ুন

×