মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বৃদ্ধি
মেধা উপেক্ষা এবং দুর্নীতির শঙ্কা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারি চাকুরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধির যেই উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করিয়াছে, উহা উদ্বেগজনক। আমরা দেখিয়াছি, এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করিয়াছেন। সামাজিক মাধ্যমেও বিষয়টি লইয়া সমালোচনা চলমান। সমালোচকদের এই দাবি সংগত, সরকারি চাকুরির নিয়োগ পরীক্ষায় ১১তম গ্রেড হইতে ২০তম গ্রেডে লিখিত নম্বর হ্রাস করিয়া মৌখিকে নম্বর বৃদ্ধি করিলে যদ্রূপ দুর্নীতির প্রসার ঘটিবে, তদ্রূপ নিয়োগে বৃদ্ধি পাইবে স্বজনপ্রীতি।
আমরা জানি, সরকারি চাকুরিতে প্রথম হইতে নবম গ্রেড পর্যন্ত নিয়োগে সরকারি কর্ম কমিশন-পিএসসি পরীক্ষা গ্রহণ করিয়া থাকে। কিছু ক্ষেত্রে দশম হইতে ত্রয়োদশ গ্রেডের নন-ক্যাডার পদে নিয়োগে পিএসসি সুপারিশ করিলেও মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তরসহ সরকারি সংস্থাগুলিই দশম হইতে বিংশতম গ্রেডে নিয়োগ হয় প্রত্যক্ষ। এই সকল পরীক্ষা গ্রহণের জন্য সচিব কমিটি মৌখিকের নম্বর বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করিয়াছে। আমরা মনে করি, এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা সংগত হইবে না। ইহাতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ লইয়াও প্রশ্ন উঠিবে।
স্মরণে রাখিতে হইবে, দেশে একদিকে বেকারত্ব ক্রমবর্ধমান, অপরদিকে বর্ধমান সরকারি চাকুরির চাহিদা। যৎকারণে আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি, ১১তম গ্রেড হইতে যেই তৃতীয় শ্রেণির চাকুরি, উহার জন্য যোগ্যতা অনেক ক্ষেত্রে এসএসসি কিংবা এইচএসসি পাস হইলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রার্থীরা আবেদন করেন। এমনকি সম্প্রতি পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসএসসি পাসের অফিস সহায়ক পদে চাকুরি হওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১৭ জনই বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএসহ মাস্টার্স ও অনার্স ডিগ্রিধারী। এমতাবস্থায় সরকারি চাকুরিতে অকস্মাৎ লিখিত পরীক্ষার নম্বর হ্রাস করিয়া মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধি করিবার যৌক্তিকতা কী? লিখিত পরীক্ষা অপেক্ষা মৌখিকে অধিক নম্বর থাকিলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষকগণের প্রভাব থাকিয়া যায়। লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া বা ন্যূনতম পাস করা প্রার্থীকেও মৌখিকে অধিক নম্বর দিয়া নিয়োগদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলস্বরূপ দলীয় বিবেচনা বা অনৈতিক উপায়ে পছন্দের প্রার্থীকে চাকরি দিবার পথ সহজ হইবে, যাহা মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করিবে।
লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণত প্রার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, মেধা এবং তাত্ত্বিক যোগ্যতা বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করা হয়, যথায় পরীক্ষকের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের সুযোগ থাকে না। অন্যদিকে মৌখিক পরীক্ষায় প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব ও আচরণ যাচাই করা হয়। যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাই লিখিত পরীক্ষাকেই অধিক গুরুত্ব দিতে হইবে, যেইখানে মৌখিক পরীক্ষার বিষয়ও সেইভাবে আসিবে।
সরকারের যুক্তি, নিয়োগ পরীক্ষায় অসদুপায় প্রতিরোধকল্পে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাই এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সামঞ্জস্য আনিতেই এই পরিবর্তন করা হইতেছে। আমরা মনে করি, লিখিত পরীক্ষায় অধিক গুরুত্ব দিয়াও ইহা সম্ভব। সমকালের প্রতিবেদনে স্পষ্ট, সরকারি প্রতিষ্ঠানের একাদশ হইতে বিংশতম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় অভিন্ন নম্বর বণ্টন বিধিমালা নাই। অভিন্ন বিধিমালা নিশ্চয়ই জরুরি, কিন্তু উহা প্রণয়নে মেধাকে উপেক্ষা করা যাইবে না। লিখিত পরীক্ষার নম্বর হ্রাস না করিয়া এবং মৌখিকের নম্বর বৃদ্ধি না করিয়া মেধাভিত্তিক অভিন্ন ব্যবস্থা সরকারকে গ্রহণ করিতে হইবে।
আমরা দেখিয়াছি, বিসিএস পরীক্ষায় পূর্বে ২০০ নম্বর থাকিলেও উহাকে সংগত কারণেই হ্রাস করিয়া ১০০তে আনা হইয়াছে। সরকারের অন্যান্য গ্রেডেও মৌখিক পরীক্ষাকে তদ্রূপ রাখিতে হইবে। অন্যায্যভাবে মৌখিকে অধিক নম্বর যুক্তিযুক্ত হইবে না। ইহাতে সরকারের নিয়োগ যদ্রূপ প্রশ্নবিদ্ধ হইবে, তদ্রূপ প্রার্থীদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়িতে হইবে। সরকারি চাকুরি যেহেতু অধিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ, সেহেতু এইখানে নিয়োগে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে মৌখিকে গুরুত্ব দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নহে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়