ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বাস্থ্য

পুষ্টিহীনতার শিকড় মাটিতে, প্রাণ ঝরছে হামে

পুষ্টিহীনতার শিকড় মাটিতে, প্রাণ ঝরছে হামে
×

সানজিদা খান রিপা

সানজিদা খান রিপা

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে হামের প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। মোট সন্দেহজনক হাম রোগী এক লাখ ৭০ হাজার ৬৩৮ জন। গত বছর হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩২; ২০২৪ সালে ২৪৭; ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১। এই বছরগুলোতে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যুর রেকর্ড নেই (প্রথম আলো, ১২ সেপ্টেম্বর)। 

পত্রপত্রিকা, টেলিভিশনের খবরে দেখেছি সরকার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো টিকা দেওয়া যায়নি বলেই এই বিপর্যয়। কথাটা সত্যি। কিন্তু ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও আইসিডিডিআর,বির যৌথ গবেষণার ফল বলছে, এসব শিশুর বেশির ভাগই মারা গেছে অপুষ্টির কারণে (ডেইলি স্টার, ২০ আগস্ট)। হাম শুধু উপলক্ষ।

এই গবেষণা ৩৫৪ জন হাম আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ বছরের নিচের শিশুর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ছিল অপুষ্টিতে ভোগা। আর যে কজন শিশু হামে মারা গেছে, তাদের বেশির ভাগই জন্মের পর প্রথম ছয় মাস ঠিকমতো মায়ের দুধ পায়নি। অথচ আমরা জানি, মায়ের দুধ শিশুকে অসুখ-বিসুখ থেকে রক্ষা করে।

মা কেন সন্তানকে পর্যাপ্ত দুধ কিংবা পুষ্টিকর খাবার দিতে পারেন না? উত্তরটা সহজ মনে হলেও এর শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। এর নাম দারিদ্র্য। 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের কৃষিশুমারি অনুযায়ী দেশের মোট খানার ১১.৩৪ শতাংশের কোনো জমি নেই। আর দেশের ২৫.৬৩ শতাংশ খানার অন্তত একজন সদস্য কৃষি মজুরির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার প্রায় ১৯ শতাংশ হলেও গ্রামে এই হার ২০ শতাংশের বেশি। এই সংখ্যাগুলো একসঙ্গে রাখলে স্পষ্ট হয়, জমির অভাব আর দারিদ্র্য বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে একে অপরের সমার্থক।

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে জমি শুধু উৎপাদনের উপকরণ নয়। এটি খাদ্য নিরাপত্তা, আয়ের স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক মর্যাদার ভিত্তি। যে পরিবারের নিজস্ব জমি নেই, তাকে নির্ভর করতে হয় অনিশ্চিত দিনমজুরি বা বর্গা চাষের ওপর। ফসলের একটা বড় অংশ চলে যায় জমির মালিকের ভাগে; বাকিটুকু দিয়ে সারাবছরের খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন। এই পরিবারের একজন মা যখন অন্তঃসত্ত্বা কিংবা সন্তানকে স্তন্যদানরত, তখন তাঁর নিজেরই পর্যাপ্ত পুষ্টি থাকে না; সন্তান কী পাবে তাঁর কাছ থেকে? 

দারিদ্র্যের এই বৃত্তে আরেকটি বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, যা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, তা হলো বাল্যবিবাহ। দরিদ্র পরিবারে আজও কিশোরী মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। এর প্রথম শিকার হয় সেই কিশোরী মা ও তার গর্ভের সন্তান। যে শরীর নিজেই তখনও পূর্ণ বিকশিত হয়নি, সেই শরীরে গর্ভধারণ ও সন্তান লালন-পালনের ভার এসে পড়ে। ফলে মা ও শিশু দুজনেই পুষ্টিহীনতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। অন্যদিকে দারিদ্র্যের চাপ পরিবারকে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত মা ও শিশুর পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকে আরও দুর্বল করে তোলে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, রাষ্ট্রের হাতে প্রায় ৩৩ লাখ একর খাসজমি রয়েছে, যা প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন হওয়ার কথা। তবে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও দেশে এখনও শতভাগ ভূমি জরিপ শেষ হয়নি। ফলে প্রকৃত ভূমিহীন পরিবার চিহ্নিত হওয়ার আগে অনেক খাসজমি চলে যাচ্ছে স্থানীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দখলে। যেসব বন্দোবস্ত-উদ্যোগ চালু আছে, সেগুলোও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া মাঝেমধ্যে থমকে যায়; আবেদন জমা পড়ার পর প্রক্রিয়াকরণ আটকে থাকে মাসের পর মাস। ফলস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত ঘোষিত বাংলাদেশের ৫৮টি জেলা ও ৪৬৪টি উপজেলা–  বাস্তবে তা হয়নি। উপরন্তু আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে বিতরণ করা অনেক ঘর আজ পড়ে আছে খালি অথবা তালাবদ্ধ; প্রকৃত মালিকের হদিস মেলে না। জমি পেলে পরিবার আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়; বাল্যবিবাহের চাপ কমে; মা-শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত হয়। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে অকালে প্রাণ হারানো শিশুর সংখ্যাও কমে আসে।

ওই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু টিকা দিয়ে শিশুমৃত্যু ঠেকানো যাবে না– যদি না শিশুর শরীর নিজেই ন্যূনতম প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। যে শিশু জন্মের পর থেকে অপুষ্টিতে ভোগে, তার জন্য একটি সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং স্বাস্থ্যনীতি যদি শুধু টিকার কভারেজ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং খাদ্য-নিরাপত্তা ও ভূমি বণ্টনের প্রশ্নকে উপেক্ষা করে, তাহলে আগামী দিনেও অন্য কোনো রোগের প্রাদুর্ভাবে আমরা একই দৃশ্য দেখব।

হাসপাতালের বিছানায় শীর্ণকায় শিশু, আর পরিসংখ্যানে আরেকটি করুণ সংখ্যা। পুষ্টিহীনতার সমাধান তাই শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার দায়িত্ব নয়। প্রয়োজন সামগ্রিক নীতি সমন্বয়। ভূমি সংস্কার ও খাসজমি বণ্টন ত্বরান্বিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত ভূমিহীন কৃষক পরিবার উৎপাদনের সুযোগ পায়।
হামের এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আমরা যতই স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়নের কথা বলি না কেন, একটি শিশুর বেঁচে থাকা এখনও নির্ভর করে তার পরিবারের কাছে কতটুকু জমি আছে তার ওপর। যতদিন না আমরা ভূমিহীনতা ও দারিদ্র্যের প্রশ্নকে স্বাস্থ্যনীতির কেন্দ্রে স্থান দিচ্ছি, ততদিন হাসপাতালের ওয়ার্ডে অপুষ্ট শিশুর সংখ্যা কমবে না; আর প্রতিটি নতুন প্রাদুর্ভাব আমাদের একই প্রশ্নের মুখোমুখি করবে। প্রয়োজন যেখানে রোগের কারণের চিকিৎসা, সেখানে আমরা করছি রোগের চিকিৎসা।

সানজিদা খান রিপা: মানবাধিকারকর্মী ও লেখক
 

আরও পড়ুন

×