সৌর বিদ্যুৎ
ভারত-পাকিস্তান এগিয়ে, বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে?
মইনুল ইসলাম
মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৯ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ছয় হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে, যা তাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ। এর মাধ্যমে পাকিস্তান বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ে সক্ষম হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ভারতেও নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ইতোমধ্যে ৭০ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। ভিয়েতনাম তাদের বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ মেটাচ্ছে নবায়নযোগ্য সূত্রগুলো থেকে। অথচ বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এখনও এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের নিচে।
একটি ভুল ধারণা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গেড়ে বসেছে– বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট জমির অভাব। অথচ ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (শ্রেডা) বলছে, দেশের বড় বড় নগর ও মফস্বল শহরগুলোর প্রাইভেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ছাদ ব্যবহারের মাধ্যমে সাত-আট হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। প্রয়োজন হবে সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ভর্তুকি-মূল্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন; সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার এবং যুগোপযোগী ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতি চালু। সরকার সম্প্রতি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে নীতিমালা ঘোষণা করলেও উল্লিখিত বিষয়গুলোতে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি। সৌরবিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা প্রচার করা হলেও বাস্তবে এমন কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। ফলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে উপকৃত হওয়ার হিসাব করে সত্যিকারভাবে আকৃষ্ট হয়।
ওদিকে ২০২৪ সালে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে ‘পিএম রুফটপ সোলার যোজনা’ চালু হয়েছে। তিন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার সোলার প্যানেল বাড়ির ছাদে স্থাপন করতে চাইলে উল্লিখিত যোজনার কাছে আবেদন করতে পারে নাগরিকরা। তিন কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনে মোট খরচ ৪৭ হাজার রুপি। এর মধ্যে সরকার ১৮ হাজার রুপি ভর্তুকি হিসেবে দেবে; বাকি ২৯ হাজার টাকা বাড়ির মালিকের নিজস্ব বিনিয়োগ। প্লান্টে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতিতে সরকার তা কিনে নেয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, মডেলটি সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগযোগ্য। অথচ বিএনপি সরকারের সদ্য ঘোষিত নীতিমালায় এ ধরনের কোনো ভর্তুকি কর্মসূচি নেই।
এ ছাড়াও দেশের অব্যবহৃত ভূমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। যেমন সম্প্রতি বাংলাদেশ চা সংসদ জানিয়েছে, চা বাগানগুলোর ৫০-৫২ শতাংশ জমিতে টেকনিক্যালি চা উৎপাদন সম্ভব। বাকি জমিতে সরাসরি সূর্যের আলো বেশি পড়ায় এগুলোতে চা গাছ বাঁচতে পারে না। তাদের দাবি, এ ধরনের জমিতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি দিলে দু-তিন বছরের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যোগ করা সম্ভব। বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা নতুন ভূমি, নদীর চরাঞ্চল, সমুদ্র উপকূল এবং নদনদী ও খালের দুপারে সোলার প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

ডেনমার্ক বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে এক হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে বিনিয়োগ প্রস্তাব বিগত শেখ হাসিনা সরকারের কাছে পেশ করেছিল, তা বিএনপির সরকারও খতিয়ে দেখতে পারে। মনে রাখতে হবে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলা শুরুর পর থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রমশ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। জুলাই-আগস্টে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঘাটতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রায় ২৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্যাপাসিটি অর্জন সত্ত্বেও দৈনিক উৎপাদনকে এখন ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াটে সীমিত রাখতে হচ্ছে। এই সংকটের জন্য প্রধানত দায়ী আমদানীকৃত এলএনজিনির্ভর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতি, যার পাশাপাশি এখন কয়লানির্ভর মেগা প্রকল্পগুলোও বড়সড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।
এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, দেশের স্থলভাগে গত ১৬ বছরে কয়েকটি ছোট ছোট গ্যাসকূপ ব্যতীত উল্লেখযোগ্য তেল-গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভোলা গ্যাসের ওপর ভাসছে বলা হলেও ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের মূল ভূখণ্ডে আনার কাজ এখনও শুরু হয়নি! ২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে মামলায় জিতে বাংলাদেশ এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার নিয়ন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও মামলায় জেতার পর ১২-১৪ বছরে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান চালানো হয়নি। ২০২৩ সালে সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করেছিল, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। আমরা জানি, বাংলাদেশের সেন্টমার্টিনের অদূরে মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমা থেকে পাঁচ টিসিএফের বেশি গ্যাস আহরণ করে চলেছে। একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামো যেহেতু বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়ও রয়েছে, তাই বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন এলাকার সমুদ্রেও গ্যাস পাওয়া যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের দৃঢ় অভিমত। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরের গোদাবরী বেসিনে ভারতও ইতোমধ্যে বিশাল গ্যাস ও তেলক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। আমরা আশা করছি, বর্তমান বিএনপি সরকার অনতিবিলম্বে সমুদ্রের ব্লকগুলোতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ব্যবস্থা নেবে।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভরতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের সোলার পাওয়ারের সাফল্য কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তা জেনে এ দেশের সোলার পাওয়ার নীতিকে অবিলম্বে ঢেলে সাজাতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব এবং ঝুঁকিমুক্ত প্রযুক্তি। সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত, এক ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ইতোমধ্যে গণচীন, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি ১০ টাকার নিচে নেমে এসেছে।
মোট কথা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ক্রমে এগিয়ে চলেছে, তখন বাংলাদেশ থেমে আছে কার স্বার্থে? ভিয়েতনাম, চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ তো সফল হয়েছেই; প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তানও সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির আশীর্বাদে বর্তমান সংকট সহজে মোকাবিলা করতে সক্ষম হচ্ছে।
আমার প্রশ্ন, সৌরবিদ্যুতে ভারত-পাকিস্তান এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে কেন? এমনকি যতটুকু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে, সেটাও কেন ‘নেট মিটারিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে নেওয়া হচ্ছে না? এই প্রযুক্তি আমদানি ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে উপযুক্ত ভর্তুকি নীতিমালা বাস্তবায়নকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না, তাও বোধগম্য নয়। এ দুটো ব্যাপারে অবিলম্বে সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার জোর দাবি জানাচ্ছি।
অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ; সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি
- বিষয় :
- সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র