অভিবাসন
ভূমধ্যসাগরের মৃত্যুফাঁদ ও আমাদের দায়
কাজী আহমেদ শামীম
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘আমি তো জোর করে কাউকে বিদ্যাশ পাঠাইছি না। যারা গেছে, মরণ জাইন্না গেছে। আমি তো কদ্দুছ মিয়ার মতো সরাসরি কাজ করি না। বেশি বেশিও করি না। আরও মাইনসে এই কাম করে। একজন পাঠাইলে আমি মাত্র ১০ হাজার টাকা পাই’– সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার সময় ১১ দিন ভেসে থাকার পর ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রচণ্ড গরমে ১১ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যুর পর সুনামগঞ্জের মানব পাচারে মধ্যস্থতাকারী (দালাল) খসরু মিয়ার এই জবানবন্দি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এটি শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধমূলক মানসিকতা বা অপযুক্তির প্রকাশ নয়; এটি সমসাময়িক বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানব পাচার সিন্ডিকেটের বিভীষিকা এবং অর্থনৈতিক প্রলোভনের মুখে মানবজীবনের চরম অবমূল্যায়নের এক নির্দয় ক্যানভাস।
ভূমধ্যসাগরের উত্তাল তরঙ্গে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও তীব্র তাপদাহে তিলে তিলে যখন একের পর এক বাংলাদেশি তরুণের প্রাণ নিভে যায়, আর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দালালরা যখন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়ে এই মৃত্যুকে ‘জেনে-বুঝে নেওয়া ঝুঁকি’ বলে চটকদার যুক্তি দেয়, তখন তা অপরাধ দমন কৌশল এবং সামাজিক সুরক্ষা কবচের ওপর এক প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়। স্বজনহারা পরিবারগুলোর যখন কান্নার শক্তিটুকুও নিঃশেষ হতে চলেছে, তখন অপরাধীদের এই নির্বিকার ও দায়হীন মন্তব্য পুরো জাতির বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসা দালালের বক্তব্য জানিয়ে দেয়, তারা নিজেদের একটি স্বাভাবিক ব্যবসার অংশীদার মনে করে, যেখানে মৃত্যু শুধু একটি সম্ভাবনাময় পরিসংখ্যান। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়া গ্রামের কদ্দুছ ও খসরুর মতো ব্যক্তিরা একসময় সাধারণ কৃষিকাজ করতেন। কিন্তু আজ তারা সাগরপথে মানুষ পাচারের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মধ্যস্থতাকারী এবং রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন।
তারা যখন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘যারা গেছে মরণ জাইন্না গেছে’, তখন তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে– এই বিপজ্জনক সমুদ্রপথের চরম ঝুঁকি ও প্রাণঘাতী পরিণতির কথা পাচারকারীরা শতভাগ অবগত। জেনে-বুঝে শত শত তরুণকে এই মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দেওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। আত্মপক্ষ সমর্থনে ‘মাত্র ১০ হাজার টাকা কমিশন’ পাওয়ার দোহাই দিয়ে খসরুর মতো মধ্যস্থতাকারীরা মূল অপরাধ থেকে নিজেদের ধুয়ে ফেলতে চায়। বাস্তবে এই দালালরা গ্রামীণ সমাজে কোনো চিহ্নিত অপরাধী হিসেবে হাজির হয় না। তারা ‘উপকারী স্বজন’, ‘শুভাকাঙ্ক্ষী প্রতিবেশী’ কিংবা ‘উন্নতির দিশারি’র ছদ্মবেশ ধারণ করে।
আন্তর্জাতিক মানব পাচার সিন্ডিকেট এই জীবনঘাতী ও ভয়াবহ পথযাত্রাকে একটি রূপক নাম দিয়েছে ‘গেম’ বা খেলা। এই নির্দোষ প্রতীয়মান শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে চরম অনিশ্চয়তা ও জুয়া খেলার বীভৎস রূপ। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে এটি কোনো নিয়মতান্ত্রিক ভ্রমণ নয়; একটি ভয়াবহ জুয়া, যেখানে নিজের জীবন ও পরিবারের ভবিষ্যৎ বাজি রাখতে হয়।
জগন্নাথপুরের রানীগঞ্জ, কলকলিয়া, চিলাউড়া এবং শান্তিগঞ্জের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত বহু তরুণের গল্প প্রায় একই রকম। জুয়েল আহমদ টিপু, হাবিব উল্লাহ, ইউসুফ আলী, সায়েক মিয়ার মতো যুবকদের পরিবার আন্তর্জাতিক দালালদের সঙ্গে ১২ থেকে ১৬ লাখ, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ২৬ লাখ টাকার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে পরিবারগুলোকে নিজেদের আবাদি জমি বিক্রি করতে হয়; শেষ সম্বল ভিটেমাটি বন্ধক রাখতে হয় কিংবা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়।
ভিজিট ভিসার আড়ালে দুবাই বা মিসর হয়ে তরুণদের নিয়ে যাওয়া হয় গৃহযুদ্ধকবলিত ও আইনশৃঙ্খলাহীন দেশ লিবিয়ায়। সেখানে পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রিত গোপন ‘সেফ হাউস’ বা আস্তানায় অভিবাসীদের কার্যত জিম্মি করে রাখা হয়। দেশে থাকা পরিবারগুলোর কাছে তাদের নির্যাতনের অডিও বা ভিডিও পাঠিয়ে বাড়তি টাকা আদায় করা হয়।
চূড়ান্ত ধাপে ভঙ্গুর কাঠের নৌকা বা পাতলা রাবার বোটে ধারণক্ষমতার তিন-চার গুণ তরুণকে গাদাগাদি করে তুলে দেওয়া হয়। ৪২ জন যাত্রী নিয়ে রওনা দেওয়া একটি রাবার বোট যখন দিক হারিয়ে ১১ দিন সমুদ্রে ভেসে থাকে, তখন সমুদ্রের বুকে কেবল হাহাকার আর মৃত্যুর পরিবেশ বিরাজ করে।
পাচারকারী কদ্দুছ ও খসরুরা গ্রামীণ বাজার ও চায়ের দোকানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে; মানুষের সঙ্গে কথা বলছে, অথচ তাদের বিষয়ে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বা নিতে পারছে না। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ভয়, লজ্জা কিংবা অপহৃত বা নিখোঁজ সন্তানকে পাচারকারীদের হাত থেকে বাঁচানোর আশায় থানায় গিয়ে সরাসরি মামলা করার সাহস পায় না। করলেও বা কী! ১৪ থেকে ১৬ লাখ টাকা একটি গ্রামীণ পরিবারের জন্য ছোট অঙ্ক নয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যদি একটি পরিবারের কাছে থাকে বা তারা জোগাড় করতে পারে, তা দিয়ে দেশে ব্যবসা, কৃষিকাজ বা আত্মকর্মসংস্থান না করে কেন সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়?
সিলেট ও পার্শ্ববর্তী হাওরাঞ্চলে ‘ইউরোপে যাওয়া’ বা ‘বিদেশে থাকা’ সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষিত ও আধাশিক্ষিত তরুণদের জন্য উপযুক্ত, সম্মানজনক ও টেকসই আয়মুখী কাজের ব্যাপক অভাব রয়েছে। তরুণরা মনে করে, দেশে এই টাকা বিনিয়োগ করে সফল হওয়া অনিশ্চিত। কিন্তু কোনোভাবে ইউরোপে পৌঁছাতে পারলে সব সংকট ঘুচে যাবে। পাচারকারীরা গ্রামীণ তরুণদের কাছে সাগরপথের ভয়াল বাস্তবতাকে গোপন করে এটি অত্যন্ত সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত পথ হিসেবে উপস্থাপন করে। ‘পৌঁছানোর পর টাকা দেবেন’ বা ‘আমাদের নিজেদের লোক সঙ্গে থাকবে’– এ রকম মিথ্যা আশ্বাসে পরিবারগুলোকে ফাঁদে ফেলা হয়।
ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আন্তর্জাতিক মানব পাচার সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হলে শুধু প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপে কাজ হবে না। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২’-এর অধীনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে পাচারকারী ও তাদের স্থানীয় এজেন্টদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দালালদের সব অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি অনুশাসন জারি করতে হবে। পুলিশ, র্যাব এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে বিশেষ মনিটরিং সেল তৈরি করে লিবিয়া, মিসর ও দুবাইমুখী ট্রানজিট রুটের অর্থদাতা ও সিন্ডিকেট প্রধানদের মূল উপড়ে ফেলতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে (যেমন সুনামগঞ্জ, সিলেট, শরীয়তপুর, মাদারীপুর) সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সত্য ঘটনা ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, স্কুল-কলেজে প্রচার এবং উঠান বৈঠকের আয়োজন করতে হবে। সমুদ্রপথের প্রকৃত বীভৎসতা মানুষের চোখের সামনে তুলে ধরতে হবে। তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সরকারি খরচে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষা প্রদান এবং স্বল্প সুদে উদ্যোক্তা ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা দেশে বসেই অর্থবহ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে।///
পরিশেষে বলব ‘মরণ জাইন্নাই তারা বিদ্যাশ গেছে’– বাক্যটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত স্খলন ও রক্ষাকবচের ব্যর্থতার জীবন্ত দলিল। পৃথিবীর কোনো মানুষই জেনে-বুঝে মৃত্যুর নীল অতলে হারিয়ে যেতে চায় না। নিষ্পাপ স্বপ্নকে পুঁজি করে যারা রক্তের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে, তাদের ক্ষমা করার কোনো সুযোগ নেই। ভূমধ্যসাগর আর যেন কোনো বাংলাদেশি তরুণের কবরস্থানে পরিণত না হয়– এ জন্য এখনই রাষ্ট্র, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ সমাজকে এক জোট হয়ে এসব পাচারকারীর বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে।
কাজী আহমেদ শামীম: অভিবাসনবিষয়ক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- অভিবাসন