ইসলাম ও সমাজ
তাকওয়াই সম্মানের মাপকাঠি
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
পৃথিবীতে সম্মানের মাপকাঠি হলো বংশ, টাকা, ক্ষমতা, সৌন্দর্য বা ডিগ্রি। মানুষ এইগুলো দিয়ে মানুষকে বিচার করে। কিন্তু মহান আল্লাহর দরবারে সম্মানের মাপকাঠি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহর কাছে রং, বংশ, টাকা-পয়সার কোনো মূল্য নেই। আল্লাহর কাছে মূল্য একটাই– তাকওয়া।
সুরা হুজুরাত-এর ১৩ আয়াতে স্পষ্ট ঘোষণা– ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’
এই একটি আয়াতই মানব ইতিহাসের সব বৈষম্য, বর্ণবাদ ও বংশবাদকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
তাকওয়া শব্দের অর্থ ভয় করা, বিরত থাকা। মহান আল্লাহর ভয়ে সব অন্যায়, অনাচার, পাপাচার থেকে বিরত থাকা এবং মহান আল্লাহর বিধান মোতাবেক জীবন পরিচালনার নামই তাকওয়া। যারা তাকওয়া অবলম্বন করে; প্রকাশ্য ও গোপনে গুনাহ করার সুযোগ পেয়েও গুনাহর কাজ থেকে বিরত থাকে, আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা সুরা মারিয়াম-এর ৬৩ আয়াতে এরশাদ করেন, ‘এটা হলো সেই জান্নাত, আমি যার উত্তরাধিকারী বানাব আমার বান্দাদের মধ্যে তাদের, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে।’
হজরত উমর (রা.) একবার উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, তাকওয়া কী? উবাই (রা.) বললেন, ‘আপনি কি কখনও কাঁটাযুক্ত পথ দিয়ে হেঁটেছেন?’ উমর (রা.) বললেন, হ্যাঁ। উবাই (রা.) বললেন, তখন আপনি কী করেছেন? উমর (রা.) বললেন, আমি কাপড় গুটিয়ে খুব সাবধানে হেঁটেছি যাতে কাঁটা না লাগে। উবাই (রা.) বললেন, এটাই হলো তাকওয়া।
দুনিয়া হলো কাঁটাযুক্ত পথ, আর গুনাহ হলো কাঁটা। সেই কাঁটা থেকে বেছে চলার নামই তাকওয়া। তাকওয়া শুধু নামাজ-রোজার নাম নয়। তাকওয়া হলো– আপনি যখন একা মোবাইলে আছেন, তখন হারাম দেখেন না। আপনি যখন অফিসে ঘুষের টাকা পান, তখন ফিরিয়ে দেন। আপনি যখন ব্যবসায় মিথ্যা বলে লাভ করতে পারতেন, তখন আল্লাহর ভয়ে সত্য বলেন।
আল্লাহ তায়ালা সুরা তাওবার ৪ আয়াতে এরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন। দুনিয়ার মানুষকে খুশি করতে অনেক কিছু লাগে। কিন্তু আল্লাহকে খুশি করতে একটা জিনিসই লাগে– তাকওয়া। যে আল্লাহর ভালোবাসা পেল, সে দুনিয়া-আখেরাতে সবই পেল। তাকওয়াবান ব্যক্তির জন্য দুনিয়াতে মহান আল্লাহর সাহায্য থাকে। আল্লাহ তায়ালা সুরা তালাক এর ২-৩ আয়াতে এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে বের হওয়ার পথ করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আজ আমাদের রিজিকের টেনশন, চাকরির টেনশন, পারিবারিক অশান্তি– সবকিছুর সমাধান তাকওয়ার মধ্যে। আমরা রিজিকের পেছনে দৌড়াই, অথচ রিজিকের মালিককে ভয় করি না।
তাকওয়া হলো সফলতার চাবিকাঠি। আল্লাহ তায়ালা সুরা বাকারার ১৮৯ আয়াতে এরশাদ করেন, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। ছাত্রের সফলতা, ব্যবসায়ীর সফলতা, শিক্ষকের সফলতা– সব সফলতার ভিত্তি হলো তাকওয়া। তাকওয়া ছাড়া যে সফলতা আসে, তা ক্ষণস্থায়ী।
তাকওয়া মানুষকে প্রকৃত সম্মানিত করে । রাসুলে কারিম (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেন– ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতা (আদম) একজন। কোনো আরবের অনারবের ওপর, কোনো অনারবের আরবের ওপর; কোনো সাদার কালোর ওপর, কোনো কালোর সাদার ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই– তাকওয়া ছাড়া।’
এই ঘোষণায় বেলাল (রা.) এর মতো একজন কালো হাবশি গোলামও আবু জাহলের মতো কুরাইশ নেতার চেয়ে সম্মানিত হয়ে গেলেন শুধু তাকওয়ার কারণে। ইসলামে বংশের কোনো দাম নেই। দাম হলো তাকওয়ার।
তাই আসুন, আমরা বাহ্যিক সম্মানের পেছনে না দৌড়ে, ভেতরের সম্মান– তাকওয়া অর্জনের পেছনে দৌড়াই। কারণ কিয়ামতের দিন কাজে আসবে শুধু একটি সুস্থ অন্তর এবং তাকওয়া।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম