ময়মনসিংহ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড
অব্যবস্থাপনার বেদনাদায়ক ফল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বুধবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, হাসপাতালটির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা স্বীকার করিয়াছেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হুড়াহুড়ি করিয়া নামিতে গিয়া এবং ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হইয়া ছয়জন প্রাণ হারাইয়াছেন, যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তাহা স্বীকার করিতে অনিচ্ছুক। অগ্নিকাণ্ডের অঘটন ঘটিয়াছে সোমবার, যথায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, নূতন আটতলা ভবনের লিফটের কন্ট্রোল রুমে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের পর ধোঁয়া ভবনের বিভিন্ন তলায় ছড়াইয়া পড়িলে আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনরা সিঁড়ি দিয়া নামিতে গিয়া পদদলিত হইয়া প্রাণ হারাইয়াছেন এবং আহত হওয়ার ঘটনা ঘটিয়াছে।
আমরা জানি, হাসপাতালে অসুস্থ ও শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষ এবং শিশু, প্রবীণ ও চলাচলে অক্ষম রোগীরাও থাকেন। অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে তাহাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরাইয়া লওয়া কঠিন। ফলে হাসপাতালের অগ্নি নিরাপত্তা ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা অন্য যেই কোনো ভবনের তুলনায় অধিক কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াইয়া পড়িলে সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় বিপর্যয়ের কারণ হইতে পারে।
অধিকতর গুরুতর বিষয় হইল, যাহা এক সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে; ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে অগ্নিকাণ্ডের সময় পাঁচ সিঁড়ির চারটিতেই তালা ঝুলানো ছিল। সকল সিঁড়ি এই সময় ব্যবহৃত হইলে হতাহতের ঘটনা হয়তো কম ঘটিত। যেইখানে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ড, করিডর, সিঁড়ি ও বহির্গমন পথ এমনভাবে প্রস্তুত রাখা দরকার, যাহাতে জরুরি মুহূর্তে রোগীদের নিরাপদে সরাইয়া লওয়া যায়, সেইখানে অধিকাংশ সিঁড়ি এইরূপে তালাবদ্ধ থাকা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। বলা বাহুল্য, জনসমাগম হয় এমন ভবনে দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ড এই দেশে অতীতে বহু ঘটিয়াছে, যেগুলিতেও এহেন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা কারণে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার দৃশ্য দেখা গিয়াছে। দুঃখজনক হইল, সেই সকল অঘটন হইতে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি নাই। তাই প্রায় একই রকম ভুল ও অবহেলার পুনরাবৃত্তি আলোচ্য ঘটনায়ও প্রত্যক্ষ করা গিয়াছে।
তবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে বিষয়টি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত, ধোঁয়া ছড়াইয়া পড়িবার কারণ, রোগীদের সরাইয়া লইবার ব্যবস্থার ঘাটতি এবং জরুরি সেবার কার্যকারিতা তথা সকল দিকই খতাইয়া দেখিতে হইবে। তদন্তের ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হইলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানা যাইবে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ লওয়া সম্ভব হইবে।
হাসপাতালের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ভবনের নিরাপত্তা কেবল অগ্নিকাণ্ডের পর আলোচনার বিষয় করিয়া রাখিলে চলিবে না। ময়মনসিংহের ঘটনা এই বার্তা দিয়াছে, দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অগ্নি নিরাপত্তা ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা নিয়মিত পরিদর্শনের বিষয়টি উপেক্ষা করা যাইবে না। এই ক্ষেত্রে যেই সকল ঘাটতি পাওয়া যাইবে, সেইগুলি পূরণ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করিতে হইবেম যাহাতে চিকিৎসা লইতে আসিয়া কোনো রোগী কিংবা স্বজনের জীবন এহেন নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিপন্ন না হয়। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই মর্মান্তিক ঘটনা হইতে শিক্ষা লইয়া হাসপাতালগুলিকে নিরাপদ করিবার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখনই জরুরি।
সরকারি হাসপাতালগুলি নানা কারণে দেশের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির রোগীদের ভরসাস্থল। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডে অধিকাংশ হতাহতের পরিচয় সেই সত্যই তুলিয়া ধরিয়াছে। আমরা প্রত্যাশা করি, এই ঘটনায় নিহত প্রতিটি পরিবারের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হইবে এবং আহতদের চিকিৎসার বিষয়ও অবহেলা করা হইবে না। সরকারি হাসপাতালগুলিতে অগ্নি নিরাপত্তার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করার কার্যকর পদক্ষেপও কাম্য।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়