প্রাণঘাতী আগাছানাশক
নিষিদ্ধই শেষ কথা নহে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
কৃষিতে বহুল ব্যবহৃত বিষাক্ত দুই আগাছানাশক নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ বিপজ্জনক বালাইনাশক হ্রাস করিবার অংশ হিসাবে বিপজ্জনক প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট বিষয়ে কৃষি বিভাগের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া আমরা মনে করি। এই দুই ধরনের বালাইনাশক আমদানি, নূতন নিবন্ধন এবং বিদ্যমান পণ্যের লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিরাপদ কৃষি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিবে।
প্যারাকোয়াট বাংলাদেশে আগাছা দমনে ব্যবহৃত হইলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ব্রাজিলসহ বিশ্বের ৭০টির অধিক দেশে নিষিদ্ধ। রাসায়নিকটির বিষক্রিয়া লইয়া প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গিয়াছে, ২০২৪ সালে দেশে ১০টি তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে প্রায় ৫০০ প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত করা হইয়াছে, যথায় দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারাইয়াছেন। পাশাপাশি গ্লাইফোসেট লইয়াও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিষয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রহিয়াছে। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা ২০১৫ সালে গ্লাইফোসেটকে মানুষের জন্য ‘সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করিয়াছিলেন।
এইরূপ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও ইতোপূর্বে বিপজ্জনক এই দুই আগাছানাশক বন্ধে ব্যবস্থা লওয়া হয় নাই। তবে এখন নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নহে, বরং বাজারে থাকা বিপুল পরিমাণ বালাইনাশক কীভাবে প্রত্যাহার ও ধ্বংস করা হইবে, তাহার কার্যকর ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। অধিকতর জরুরি, নিষিদ্ধ হইবার পরও যাহাতে এইগুলি অবৈধভাবে বিক্রয় বা ব্যবহার না হয়, তজ্জন্য বাজার, গুদাম ও আমদানি পর্যায়ে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করিতে হইবে। বিশেষত সীমান্ত ও বন্দর দিয়া অবৈধভাবে এই সকল রাসায়নিক প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করিতে হইবে। ইহার সহিত কৃষক পর্যায়েও নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রাখিতে হইবে।
আগাছা দমনে কৃষককে কার্যকর, সহজলভ্য ও তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প দিতে হইবে। অন্যথায় এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নানা জটিলতা সৃষ্টি হইতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষকদের নিরাপদ আগাছা দমন পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হইবে। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, যান্ত্রিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধি করিতে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা দরকার।
উদ্বেগজনক বিষয়, আমাদের দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার ক্রমেই বৃদ্ধি পাইয়াছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২৫ সালে ৪০ সহস্র টনের অধিক বালাইনাশক আমদানি হইয়াছে, যথায় সাড়ে সাত সহস্র ব্র্যান্ড নামে এই সকল পণ্য নিবন্ধিত। আরও উদ্বেগের বিষয়, প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট নিষিদ্ধকরণের পরও আরও ১৭টি উচ্চ ঝুঁকির বালাইনাশকের ব্যবহার অব্যাহত। এই সকল রাসায়নিক বিষয়েও সিদ্ধান্ত লইতে হইবে।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করিতে খোদ রাসায়নিকের ব্যবহার লইয়াই বিতর্ক রহিয়াছে। যথায় পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক ব্যবস্থা অনেকে আবিষ্কার করিয়াছেন। উহার পরও রাসায়নিকের ব্যবহারের প্রয়োজন হইলে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির সহিত কৃষক, ভোক্তা ও পরিবেশের নিরাপত্তার সমন্বয় জরুরি। তাহা না হইলে সেই উৎপাদন টেকসই হইতে পারে না। কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহার হইলে উহা খাদ্যে চলিয়া যায়। উহা কেবল খাদ্যকেই বিষাক্ত করে না; উহার সহিত মাটি ও পানিকে দূষিত এবং কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। তজ্জন্য কৃষিনীতিতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের শুরুটা হইতে হইবে নিরাপদ কৃষি।
সরকারের প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট বিষয়ে সিদ্ধান্তের সদিচ্ছা হইতে আমরা প্রত্যাশা করি, অন্যান্য বালাইনাশক পর্যালোচনারও পথ তৈরি করিবে। পাশাপাশি কৃষককে নিরাপদ বিকল্প, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হইবে। ইতোমধ্যে কৃষিমন্ত্রী জানাইয়াছেন, প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেটের মতো বিষাক্ত ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের ক্ষতির মাত্রা নিরূপণে পেশাজীবী ও গবেষকদের সমন্বয়ে সরকার কমিটি গঠন করিয়াছে, যাহা আমাদের কৃষির পথ সুগম করিবে বলিয়া আমরা প্রত্যাশা করি।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়