ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যের আগুনে ইসরায়েল-আমিরাত আঁতাতের ঘি

মধ্যপ্রাচ্যের আগুনে ইসরায়েল-আমিরাত আঁতাতের ঘি
×
×

জাহিদ হুসেন

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান সামরিক অভিযান সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে দ্বিপক্ষীয় সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাত যান। অন্যদিকে গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকালে যখন ৭৭টি দেশ বয়কট করে কক্ষ ত্যাগ করে, তখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রতিনিধি দল তাদের আসনে বসেই ছিল, যার অর্থ ইহুদিবাদী দেশটির প্রতি এক স্পষ্ট সংহতি প্রকাশ।

২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে ইউএই কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেনি, বরং তা আরও সামনে বাড়িয়ে এক প্রকার ডি ফ্যাক্টো বা বাস্তবসম্মত সামরিক মৈত্রী পর্যন্ত নিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, গাজায় যখন ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখনও এ সম্পর্ক বজায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অযাচিত যুদ্ধের কারণে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

আমেরিকার ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের এই অভাবনীয় সম্পর্ক দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি উদীয়মান অশুভ আঁতাতকে চিহ্নিত করে। আইরন ডোম বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও, যা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দ্বারা পরিচালিত– ইউএই নিজেই ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নিয়েছে এবং তার জবাবে ইরান থেকেও ধ্বংসাত্মক ও ভয়াবহ পাল্টা হামলার মুখোমুখি হয়েছে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এই প্রথমবার এতটা উন্নত একটি সামরিক প্রযুক্তি অন্য কোনো দেশে মোতায়েন করা হলো, যা ইসরায়েল নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোটে আমিরাতের মূল ভূমিকার ইঙ্গিতবহ। পাশাপাশি এটিই প্রথম আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক, যা সত্যিকার অর্থে সামরিক ও শিল্প কাঠামোর রূপ পেয়েছে। তা ছাড়া এই ইসরায়েল-ইউএই যোগাযোগ কেবল চলমান ইরান যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; নেতানিয়াহু যেটিকে জোটের ষষ্ঠভুজ বলে উল্লেখ করেছেন, তা বাস্তবায়নে ইউএই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী প্রথম এই ধারণার কথা প্রস্তাব করেন। ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে নেতানিয়াহু ‘মধ্যপ্রাচ্যে বা তার আশপাশে একটি জোটের ষষ্ঠভুজ’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা পেশ করেন। এটি তাঁর মতে ‘উগ্র শিয়া এবং উদীয়মান সুন্নি শক্তি’র বিরুদ্ধে একটি বলয়। তিনি চার সদস্য– ইসরায়েল, ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের নাম উল্লেখ করেন এবং বাকি শূন্যস্থানগুলো– আরব, আফ্রিকান ও এশীয় রাষ্ট্রের নাম গোপন রাখেন। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে গভীর কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ইউএই-কে সেই ছয় দেশের একজন হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয়।

নেতানিয়াহু ভারত-ইসরায়েল গোয়েন্দা বিনিময় ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতাকে এই প্রকল্পের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। ফেব্রুয়ারিতে মোদির সেই সফরে দুই দেশের মধ্যে একটি ‘বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ গড়ে ওঠে, যাদের সামরিক ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ইসরায়েল ভারতের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। অন্যদিকে ইউএই-ও নয়াদিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ এই তিনটি দেশই চারদেশীয় আই২ইউ২ জোট এবং আইএমইসি বা ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোরের সদস্য। দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দ্বারা আবদ্ধ এই জোটের বিস্তৃতি এশিয়া এবং তার বাইরের নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করছে।

যদিও প্রস্তাবিত এই ছয় দেশের জোট এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়নি, তবে এটিকে ব্যাপকভাবে মক্কা জোটের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেটিকে ইসরায়েল ভুলভাবে একটি সুন্নি জোট হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করে। নেতানিয়াহু বারবার তুরস্ককে ইরানের চেয়েও বড় হুমকি এবং তাঁর গ্রেটার ইসরায়েল স্বপ্নের পথে বড় বাধা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও ইউএইর ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক এবং সামরিক সহযোগিতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আমেরিকার দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধে বিপর্যস্ত মধ্যপ্রাচ্য এবং পুরো অঞ্চলের জন্য এই খবর মোটেও ইতিবাচক নয়। তা ছাড়া ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে।

গত সপ্তাহে জোটবদ্ধ তিনটি দেশের সামরিক প্রধানরা এই অবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে বৈঠকে বসেছিলেন। গুঞ্জন উঠেছে, জোটের ৫ নম্বর ধারা, যার অধীনে যে কোনো এক সদস্যের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা বলে ধরে নেওয়া হয়; তা কার্যকর করা হতে পারে। এমন কোনো পদক্ষেপে পাকিস্তান সরাসরি এই যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে পারে। ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার লক্ষণ এখনও অনেক দূরে। তাই সংঘাত প্রসারিত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ পটভূমিতে ইসরায়েল ও ইউএইর মধ্যকার এই অশুভ আঁতাত দূরগামী প্রভাব ফেলে অঞ্চলটিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।

জাহিদ হুসেন: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক; দ্য ডন থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
 

আরও পড়ুন

×