আন্তর্জাতিক
ইসরায়েল ইস্যুতে রিপাবলিকানে ভাঙনের সুর
সায়িদ আরিকাত
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ইসরায়েলের সঙ্গে মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির শক্তিশালী জোট রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদেও এই জোটের বার্তা বারবার দেখা গেছে। অর্ধশতাব্দী আগে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রক্ষণশীল খ্রিষ্টানদের উত্থানের মধ্যেই এর পত্তন হয়েছে। রেভারেন্ড বিলি গ্রাহামের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সম্পর্ক হোয়াইট হাউসে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারের রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটাতে সাহায্য করেছিল। গ্রাহাম অবশ্য পরে, বিশেষত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর এই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার জন্য অনুশোচনা করেছিলেন। কিন্তু যে পথ খুলে গিয়েছিল, তা আর বন্ধ হয়নি। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে জেরি ফলওয়েলের মোরাল মেজরিটি সংগঠনটি রক্ষণশীল ধর্ম প্রচারকদের একটি শক্তিশালী রিপাবলিকান ভোটারগোষ্ঠীতে পরিণত করে, যাকে রোনাল্ড রিগ্যান তাঁর রক্ষণশীল জোটে অন্তর্ভুক্ত করে নেন।
ইসরায়েল এই রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রীয় অংশ হয়ে ওঠে। অনেক ধর্ম প্রচারক ইসরায়েলকে নিছক কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বাইবেলের ধর্মীয় চেতনার আলোকে দেখতে শুরু করেন। পরে ধর্ম প্রচারপন্থি টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব জন হ্যাজি এবং ‘খ্রিষ্টানস ইউনাইটেড ফর ইসরায়েল’-এর মতো নেতারা একটি প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যা এই ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে রূপান্তরিত করে। একসময় যা রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের কাছে ধর্ম প্রচারকদের প্রবেশাধিকার দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত এক স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপ নেয়।
খ্রিষ্টান জায়নবাদীদের কাছে এই জোট কেবল ধর্মীয় সহমর্মিতার বিষয় নয়। অনেকেই ইসরায়েলকে বাইবেলের শেষ সময়ের ভবিষ্যদ্বাণী এবং যিশু খ্রিষ্টের প্রত্যাশিত পুনরাগমন সংক্রান্ত ধারণার কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন। এসব বিশ্বাস ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনকে একটি সাধারণ পররাষ্ট্রনীতির পছন্দ থেকে এক ধর্মীয় অঙ্গীকারে পরিণত করেছে। ধর্ম প্রচারক ভোটাররা রিপাবলিকানদের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠার পর রাজনীতিকদের সামনেও এই অঙ্গীকারকে গ্রহণ করার শক্তিশালী নির্বাচনী তাগিদ তৈরি হয়। ফলে ধর্মতত্ত্ব, দলীয় আনুগত্য এবং কৌশলগত স্বার্থ; সবকিছু একসূত্রে গেঁথে যায়।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী
আজকের রিপাবলিকান নেতারা এই ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার ও লুইজিয়ানার প্রতিনিধি মাইক জনসন এই সমসাময়িক প্রভাবের অন্যতম প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক যে কেবল প্রথাগত; কৌশলগত অংশীদারিত্ব নয়– তা বোঝাতে তিনি বাইবেলের বাণীর দোহাই দিয়েছেন। তাঁর স্পিকারের পদ তাঁকে আইন প্রণয়ন, কংগ্রেসের বাজেট বরাদ্দ এবং ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তাবিষয়ক বিতর্কে বিশেষ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়।
টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ একইভাবে বারবার স্পষ্টত ধর্মীয় ও খ্রিষ্টান পরিভাষায় ইসরায়েলকে সমর্থনের কথা বলেছেন। অন্যদিকে আরকানসাসের সিনেটর টম কটন এই জোটের একটি জাতীয়তাবাদী ও যুদ্ধংদেহী রূপ তুলে ধরেন। নথিপত্রে ওয়েস্ট ব্যাংক বা পশ্চিম তীরের পরিবর্তে ‘যুদাইয়া ও সমারিয়া’ নাম ব্যবহারে তার চেষ্টা থেকে বোঝা যায়, কীভাবে বাইবেলের ভাষা সরকারি নীতিতে স্থান করে নিতে পারে।
আরকানসাসের সাবেক গভর্নর এবং ট্রাম্প ইসরায়েলবিষয়ক বর্তমান রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি একই ধর্ম প্রচারপন্থি খ্রিষ্টান নীতি ও রিপাবলিকান রাজনীতির সংযোগস্থলকে প্রতিনিধিত্ব করেন। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পক্ষে তাঁর অবস্থান এবং প্রথাগত ভৌগোলিক পরিভাষা বর্জন করার ঘটনা এমন এক বিশ্ববীক্ষাকে প্রতিফলিত করে, যেখানে ধর্মীয় বা বাইবেলীয় দাবি রাজনৈতিকভাবে বেশ ওজন বহন করে।
পরিবর্তনশীল রিপাবলিকান ঐতিহ্য
ইসরায়েল কেবল একটি পররাষ্ট্রনীতির বিষয় হিসেবে থাকেনি। কোটি কোটি রক্ষণশীলের কাছে ইসরায়েলকে সমর্থন করা রিপাবলিকান পার্টির ধর্মীয় ও নৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল। সেই ঐতিহ্য এখনও শক্তিশালী, কিন্তু তার ভিত নড়ে উঠছে। তরুণ রিপাবলিকানরা বড় হয়েছেন ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ, ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদ, বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি অনীহা এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ দেখার মধ্য দিয়ে। তাদের প্রশ্নগুলো এখন আর শুধু ধর্মতত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। যেমন ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দিয়ে কী অর্জিত হচ্ছে; এর পেছনে কী মূল্য দিতে হচ্ছে এবং কখন ধর্মীয় বিশ্বাসকে কৌশলগত বিবেচনার কাছে জায়গা ছেড়ে দেওয়া উচিত– এসব প্রশ্ন হয়তো রাতারাতি এই বড় জোটকে ভেঙে ফেলবে না, তবে এর ভেতরে পরিবর্তন আনবে।
ধর্ম প্রচারক সংগঠনগুলোর কাছে এখনও প্রচুর সম্পদ, রাজনৈতিক নেতাদের সান্নিধ্য এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা রয়েছে। কংগ্রেসের ভেতরে তাদের সহযোগীরা বেশ প্রভাবশালী পদে আছেন এবং জনমতের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই দলীয় ইশতেহার বা কংগ্রেসের ভোটে তা প্রতিফলিত হয় না। তবে প্রবীণ ধর্ম প্রচারক ভোটার এবং তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যে এই ক্রমবর্ধমান দূরত্ব দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। খ্রিষ্টান জায়নবাদ একসময় এতটাই সফল হয়েছিল যে, তাদের মূল নীতিগুলো রিপাবলিকানদের মূল আদর্শে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু যে জোট কেবল ধর্মীয় আবেগ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব এবং দলীয় আনুগত্যের ওপর ভর করে টিকেছিল; নতুন প্রজন্ম যখন সেই ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, তখন তাকে বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সায়িদ আরিকাত: ওয়াশিংটনভিত্তিক
সাংবাদিক; আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক