আন্তর্জাতিক বাজার
রাশিয়ার তেল কিনে ট্রাম্পের শেষ রক্ষা হবে?
অ্যান্থনি জার্কার
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এক অকল্পনীয় অবস্থান এটি। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ট্রাম্প এমন একটি আইনে স্বাক্ষর করেছিলেন, যা রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আমদানিকারী দেশগুলোর ওপর নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের অনুমোদন দিয়েছিল।
ট্রাম্প বলছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী মাসগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে শত শত হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন ভোটাররা ভোট দেওয়ার আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি; অথচ রাজনীতির পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দামের ওপর ইরান যুদ্ধের যে প্রভাব পড়েছে, তা সামলাতে ট্রাম্পকে এখনও কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় জর্জরিত জনগণের কাছে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই কমে গেছে। এই যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে মার্কিন কৃষিভিত্তিক রাজ্যগুলোতে, যেগুলো কৃষি যন্ত্রপাতি চালানো এবং বাজারে পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যাপকভাবে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।
আইওয়া, কানসাস, টেক্সাস এবং ওহিওর মতো রাজ্যগুলো আসন্ন নির্বাচনে হঠাৎ করে রাজনৈতিক লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এগুলোই নির্ধারণ করবে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কিনা। তাই বেশ কয়েক মাস ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর দলের এই রাজনৈতিক সংকট কাটাতে নানা পথ খুঁজছেন।
তাদের নিজস্ব তেলের মজুত আরও বেশি করে ব্যবহার করতে সম্প্রতি তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের চাপ দিয়েছিলেন। তিনি জ্বালানির ওপর থেকে ফেডারেল ট্যাক্স সাময়িকভাবে স্থগিত করেন এবং কৃষির জন্য বরাদ্দকৃত জ্বালানি আন্তঃরাজ্য ট্রাক চলাচলেও ব্যবহারের অনুমতি দেন। এ ছাড়া তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের ওপর নতুন করে কোনো হামলা চালাবেন না, যা চলমান সংঘাতের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে তাঁর একটি অপ্রত্যাশিত ও সরাসরি স্বীকারোক্তি। ফলে রাশিয়ার পুতিনের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর এ সিদ্ধান্ত তাঁর নেওয়া সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও নাটকীয় একটি উদ্যোগ।
অবশ্য ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টগুলোতে প্রায়ই অসম্পূর্ণ তথ্য থাকে। রাশিয়া কীভাবে বিশ্ববাজারে এই জ্বালানি সরবরাহ করবে এবং এর বিনিময়ে অতি প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়াও তারা আর কী পাবে– তা এখনও অস্পষ্ট। এই পদক্ষেপের কারণে ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্র এবং মার্কিন রাজনীতিকদের কাছ থেকে এ সমালোচনার মুখে পড়েছেন যে তাঁর প্রশাসন এখন রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে অর্থ জোগাতে সাহায্য করছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই চুক্তিকে পুতিনের জন্য একটি ‘উপহার’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, রাশিয়া এর প্রতিদান দেবে ‘সন্ত্রাস ও প্রতারণা’ দিয়ে। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘রাশিয়াকে পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রি করতে দেওয়া মানে এমন একটি যুদ্ধে বিনিয়োগ করা, যা দীর্ঘায়িত না করে অবিলম্বে শেষ করা উচিত।’
নির্বাচন সামনে রেখে গৃহীত এই পদক্ষেপ রিপাবলিকানদের কতটা সুবিধা দেবে, তাও অনিশ্চিত। ইউরোপের ডিজেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি তেলের বাজারে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি, আর রাশিয়ার জ্বালানি কত দ্রুত বাজারে প্রবেশ করতে পারবে সে সম্পর্কেও কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তা ছাড়া ইউক্রেনের একের পর এক হামলায় রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যে হামলাগুলো ট্রাম্প নিজে থেকেই জেলেনস্কিকে কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন আনুমানিক ৩৬ লাখ ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। তাই রাশিয়া যদি চলতি মাসে প্রতিশ্রুত তিন লাখ টন ডিজেলও সরবরাহ করে, তবে তা মার্কিন দৈনিক চাহিদার আনুমানিক অর্ধেক পূরণ করবে। মার্কিন নাগরিকদের জ্বালানি সংকট তাতে খুব একটা কমবে না।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক মাসেরও কম সময় বাকি আছে, তবে ইতোমধ্যে অনেক রাজ্যে আগাম ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে গেছে। অর্থাৎ সাধারণ কথায় বললে, নির্বাচনের ভোটের রায় একপ্রকার নির্ধারণ হয়ে গেছে। ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে লিখেছেন, ‘আমাদের মহান কৃষক, খামারি এবং চালকদের জন্য কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করা আমার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।’ কিন্তু বিগত সাত মাসে ট্রাম্প ও তাঁর সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়া এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব কাটার বহু আশ্বাস দিলেও জ্বালানি, তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে।
অ্যান্থনি জার্কার: বিবিসির উত্তর আমেরিকার সংবাদদাতা; বিবিসি থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক