ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আইনশৃঙ্খলা

খুলনায় বাড়বাড়ন্ত অপরাধ

খুলনায় বাড়বাড়ন্ত অপরাধ
×
×

মো. আসাদুজ্জামান

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩৬

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরী খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটেছে। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, কৌশলগত স্থানে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ কেনাবেচা এবং সশস্ত্র ছিনতাইয়ের ধারাবাহিক ঘটনায় সাধারণ নগরজীবন নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের সংকটে নিপতিত হয়েছে।

নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কগুলোতেও এখন এক ধরনের ভীতিকর নীরবতা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই ভঙ্গুরতা আরও বেশি দৃশ্যমান করে তুলেছে খুলনা জেলা পুলিশ প্রশাসনের একটি নজিরবিহীন দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত, যেখানে সন্ত্রাসীদের সম্ভাব্য হামলার হাত থেকে রক্ষা পেতে খোদ পুলিশ সদস্যদেরই রাতের বেলায় একা চলাচল না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এই রক্ষণাত্মক অবস্থান নগরবাসীর মনে আস্থা ফেরানোর বদলে নিরাপত্তাহীনতার বোধ বাড়িয়ে দিয়েছে।   

জাতীয় পত্রপত্রিকা ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা তথ্যে খুলনার অপরাধের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের জন্ম দেয়। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে খুলনা জেলায় অন্তত ৩৫টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার মধ্যে ১০টি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ বা মূল আসামিদের এখনও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। 

অন্য এক স্বাধীন পর্যবেক্ষণে চলতি বছরেই সমগ্র খুলনা অঞ্চলে মোট সহিংস হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৭৩ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু আগস্ট মাসের প্রথম ২০ দিনে নগরী ও এর আশপাশের এলাকায় ছয়জন নিহত হয়েছেন, যাদের সিংহভাগকেই টার্গেট করে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে।   

খুলনার সামগ্রিক প্রশাসনিক সক্ষমতার সংকটটি সবচেয়ে প্রকাশ পায় যখন নগরীতে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তারা দুষ্কৃতকারীদের সরাসরি আক্রমণের শিকার হন। রূপসা উপজেলায় অপরাধী গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিশেষ অভিযান শেষ করে গভীর রাতে নগরীতে ফেরার পথে খুলনা জেলা পুলিশের পরিদর্শক মো. শাহ আলম ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়েন। তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে দুষ্কৃতকারীরা ধারালো চাপাতি দিয়ে তাঁর দুই হাতের কবজিতে নৃশংসভাবে কোপ মেরে গুরুতর জখম করে এবং মোবাইল ফোন-টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। 

এই ভয়াবহ ঘটনার পরপরই খুলনা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) থেকে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা এলাকার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ দিয়ে একটি প্রশাসনিক চিঠি জারি করা হয়। জেলা পুলিশ প্রধানের মতে, এটি সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার একটি অভ্যন্তরীণ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হলেও এর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া হয়েছে সুদূরপ্রসারী।   

খুলনার অপরাধ প্রবণতার নেপথ্যে ভৌগোলিক অবস্থান ও অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা একটি বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। খুলনা শহর ও এর পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলো ভৈরব ও রূপসা নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত। শহরের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উপজেলাগুলোর ভৌগোলিক সীমান্ত এবং নদীর সীমানা অপরাধীদের জন্য এক ধরনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি করে দিয়েছে। রূপসা, তেরখাদা বা দিঘলিয়ার মতো নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত নৌপথে পার হয়ে অন্য প্রশাসনিক এখতিয়ারে গিয়ে অপরাধীরা সহজেই আত্মগোপন করতে পারে।   

তা ছাড়া খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি) এবং খুলনা জেলা পুলিশের সীমানা ও প্রশাসনিক তদারকির সমন্বয়হীনতার সুযোগ নেয় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো। সামাজিক ক্ষেত্রে সান্ধ্যকালীন যাতায়াত এবং স্বাভাবিক সামাজিক বিনোদন অনেকটাই থমকে গেছে। এমনকি শারদীয় দুর্গাপূজার মতো বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবগুলোতেও নাশকতার আশঙ্কায় ভক্ত ও পূজামণ্ডপ কমিটিগুলোর মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে অপরাধের কোনো রাশ টানা সম্ভব হচ্ছে না।

খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে কেবল রুটিনভিত্তিক অভিযান যথেষ্ট নয়; বরং একটি সুদূরপ্রসারী ও জোরালো প্রশাসনিক কৌশলের বাস্তবায়ন জরুরি। পুলিশ বাহিনীকে ‘রক্ষণাত্মক’ নীতি ত্যাগ করে আক্রমণাত্মক ও উচ্চ-সচেতনতামূলক টহল জোরদার করতে হবে। রাতের বেলায় কেবল বিশেষ অভিযানই নয়, প্রধান প্রধান সড়ক ও গলিমুখে সার্বক্ষণিক চেকপোস্ট এবং রোবস্ট মোটরসাইকেল প্যাট্রোলিং নিশ্চিত করা আবশ্যক। সীমান্ত ও নদীপথ দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্রের রুট চিরতরে বন্ধ করতে নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা ও মহানগর পুলিশকে যৌথ অভিযান চালাতে হবে। 

চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে গ্রেপ্তার নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় গ্যাং কালচার এবং তাদের নেপথ্যে থাকা তথাকথিত ‘বড় ভাই’ বা আশ্রয়দাতাদের আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, বিচার করতে হবে।

মো. আসাদুজ্জামান: সহকারী অধ্যাপক, আইন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

আরও পড়ুন

×